নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দৃষ্টান্ত জার্মানির ফিন্ডহেইম

ঢাকা,৩০অক্টোবরঃ ১৫০ জন সনসংখ্যার গ্রাম ফিন্ডহেইম। জার্মানির রাজধানী বার্লিন শহর থেকে গ্রামটির দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার। ছোট এই গ্রামটির মানুষগুলোই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে দৃষ্টি কেড়েছে সবার। বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিড থেকে পৃথক হয়ে শতভাগ স্থানীয় বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার শুরু করেছে এই গ্রামের বাসিন্দারা যা ইতোমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

জীবাশ্ম জ্বালানি ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ বাদ দিয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের ভাবনা রয়েছে অনেক দেশের, হয়েছে নানা পরিকল্পনা যা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হতে সময় লাগবে দশকেরও বেশি সময়। বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্রের নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের বিষয়টি যেখানে ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে সেখানে ফিন্ডহেইম গ্রাম যে এগিয়ে গেছে বহু দূর তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তাদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের সরবরাহ আসে ফসলের মাঠে স্থাপিত উইন্ড পার্কের টাওয়ারগুলো থেকে। সেগুলো অবিরত ঘুরছে এবং ফিল্ডহেইমের নিজস্ব ছোট্ট স্মার্ট গ্রিডে শক্তি সরবরাহ করছে।এ ছাড়া স্থানীয় একটি সৌরপার্ক থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যেখানে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘাঁটি ছিল।

ফিল্ডহেইমের বাড়িতে বাড়িতে রয়েছে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। গবাদিপশুর বর্জ্য এবং ফসলের ফেলে দেওয়া অংশ প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদিত গ্যাসের সাহায্যে শীতকালে লোকজনের ঘর উষ্ণ রাখার যন্ত্র বা হিটার চালানো হয়। এই ব্যবস্থার জন্য গ্রামবাসী ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি নিয়েছে। আর প্রকল্পটিতে অংশীদারি রয়েছে এনার্জিক্যাল নামের একটি জ্বালানি সমবায় প্রতিষ্ঠানের। এনার্জিক্যালের প্রতিনিধি ওয়ার্নার ফ্রোইটার বলেন, হিটারের জন্য বছরে প্রয়োজনীয় এক লাখ ৬০ হাজার লিটার তেল এখন আর কিনতে হচ্ছে না। তাই সেই অর্থ কোনো আরব শেখ বা অন্য কোন রাষ্ট্রের কাছে যাচ্ছেনা বলেও জানান তিনি।

bio-gas-plant

সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলতে হলে কার্বন নির্গমন একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। আর সেই লক্ষ্য পূরণ করার জন্য ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি ‘এনার্জিওয়েন্ড’ নামের বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই জার্মানির সবচেয়ে বড় অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়ন করাটা তাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

জার্মানির পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২২ সালে দেশটির সর্বশেষ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হবে। আর চলতি শতকের মাঝামাঝি পর্যায়ে তারা নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদার ৮০ শতাংশই নবায়নযোগ্য জ্বালানির সাহায্যে পূরণ করবে। এ জন্য দেশটির এখানে-সেখানে স্থাপন করা হয়েছে অনেক উইন্ড পার্ক, যেগুলো বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলে এ ধরনের উইন্ড পার্কের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আর বাড়িঘর ও শিল্পকারখানার ছাদে দেখা যায় সোলার ডিশ বা সৌরবিদ্যুৎ সংগ্রহের যন্ত্র।

এসব উদ্যোগে উৎসাহিত করতে সরকার ২০ বছরের জন্য প্রণোদনা দিচ্ছে। তবে উদ্যোগের ব্যয় ক্রমশ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।জার্মানির রাসায়নিক শিল্প সংস্থা চলতি মাসে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, জ্বালানি রূপান্তরের জন্য দেশের অর্থনীতি ও ভোক্তাদের যে মূল্য দিতে হচ্ছে, তা ক্রমশ বাড়বে।

মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলার লক্ষ্যেই জার্মানি এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, গত দুই বছরে কার্বন নির্গমন বৃদ্ধিই পেয়েছে। সমস্যাটার কারণ লুকিয়ে আছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকৃতির মধ্যেই। যখন সূর্যের আলো সরাসরি আসে না এবং বাতাসও সেভাবে পাওয়া যায় না, শূন্যতা পূরণের জন্য তখন প্রচলিত জ্বালানির ওপরই নির্ভর করতে হয়।

জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল ইউরোপে কার্বন নির্গমন প্রতিরোধে প্রচলিত ব্যবস্থায় সংস্কার আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইউরোপে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কার্বন নির্গমনের মাশুল নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

‘এনার্জিওয়েন্ড’ প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। এখন পর্যন্ত জনপ্রিয় প্রকল্পটির প্রতি জার্মানির সব রাজনৈতিক দলেরই সমর্থন রয়েছে।  সুত্রঃ এএফপি

সবুজপাতা প্রতিবেদন

scroll to top