কোরবানির ঈদ:ওষুধে গরু মোটাতাজা হচ্ছে!

goru1.jpg

ঢাকা: ১৭ আগষ্ট:  কোরবানির ঈদের বাজার ধরতে তিনমাসের সময় ধরে এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলছে গরু মোটাতাজাকরণ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর,  রংপুর, দিনাজপুর, নিলফামারি, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারিপুর, ময়মনসিংহ ও ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে ক্ষতিকর নানা ওষুধ ও রাসায়নিক সেবনের মাধ্যমে গরু মোটাতাজা চলছে। এ বছর দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোতেই অন্তত এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের আড়াই লক্ষাধিক গরুকে অবৈধ পন্থায় মোটাতাজাকরণ করা হচ্ছে। সিরাজগঞ্জেও লক্ষাধিক ষাঁড় কোরবানির জন্য প্রস্তু‘ত করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে, যেসব গরুকে পাম ট্যবলেট, ডেক্সামেথাথন ও স্বেদ্বরয়েড খাইয়ে মোটাতাজা করা হয় সেগুলোর মাংস খেলেও মানবদেহে ওইসব রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চিকিৎসকরা বলছেন, কোরবানির মোটা গরু মানেই মানুষের জন্য তাজা বিষ। ভোক্তাদের অভিযোগ, সরকারের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বেশির ভাগ উদ্যোগ ফরমালিনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক নিয়ে সরকারের তেমন মাথাব্যথা নেই।

ঈদের দুই থেকে তিন মাস আগে রোগাক্রান্ত   ও শীর্ণকায় গরু অল্ক টাকায় কিনে বিষাক্ত হরমোন, ইনজেকশন ও রাসায়নিক ওষুধ প্রয়োগ করে গরুকে মোটাতাজা করে। বেশি মুনাফার লোভে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ডোজ ব্যবহার করে ফুলিয়ে ফাপিয়ে বড় করে গরুগুলো কোরবানির হাটে তোলে। গরুগুলো ঈদের এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাই না করলে নিজে নিজেই মরে যায়। কারণ গরুর শরীরের পরতে পরতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় স্বেদ্বরয়েড, হরমোন কিংবা তার চেয়েও ভয়ংকর সব রাসায়নিক।

Cowমোটাতাজা গরুর মধ্যে পাবনা ব্রিড, অষ্ট্রেলিয়ান-ফিদ্ধজিয়ান ব্রিড, ইন্ডিয়ান হরিয়ানা ব্রিড, পাকিস্থানি সাহিয়াল ব্রিড, হেমাটোপিনসহ কিছু পরিচিত ব্র্যান্ড। তবে এর পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় ব্রিডিং প্রদ্ধতি যা লোকাল ক্রস ব্রিড নামে পরিচিত। এসব ব্র্যান্ডের সব গরুই মোটাতাজাকরণ প্রত্রিক্রয়ায় বড় করা হচ্ছে।

ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে গরু মোটাতাজা করেছেন মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের আছিমপুরের খামারী জানান, গত সপ্তাহে তিনি মোটাতাজা করতে ১৫টি গরু কিনেছেন।  তিনি জানান, চিকিৎসকের পরামর্শমতো  তিনি অনেক দামি ইনজেকশন, ট্যাবলেট ও পাউডার ওষুধ খাওয়ানো শুরু করেছেন। তার খামারে গরুকে ক্যাটেল কেয়ার, ইনজ্যাইভিট, এনোরা, সেটরন ইত্যাদি ওষুধ খাওয়ানো হয়ছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের সহকারি পরিচালক (প্রাণী স্বাস্থ্য) ডা. ফরহাদুল আলম জানান, ক্ষতিকর ওষুধ সেবনের মাধ্যমে মোটাতাজা করা গরু কোরবানির হাটে তোলা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, এবার প্রতিটি গরুর হাটে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ টিমের মাধ্যমে গরুর রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। যদি কোনো গরুর রক্ত পরীক্ষায় বিষাক্ত কিছু ধরা পড়ে তাহলে সেই গরুকে সিল করে দেওয়া হবে এবং গরু বিক্রেতার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ওষুধে গরুর দেহে অধিক মাত্রায় পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এতে গরুর শরীর ফুলে-ফেঁপে ওঠে, দুলদুলে ও স্বাস্থ্যবান দেখায়। অপরদিকে গরু দ্রুত মোটাতাজা হয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে কিডনির কার্যকারিতা কমে যায়। এ কারণে গরুর হৃৎপিণ্ড ও যকৃত  মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ  হয়। গরু ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানির ঈদের আড়াই থেকে তিন মাস আগে হাট থেকে কম দামে শীর্ণকায় গরু কিনে কোরবানির ঈদের আগ পর্যন্ত  খাবারের সঙ্গে ক্ষতিকারক পাম বড়ি খাওয়ানো হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এই বড়ি ভারত ও পাকিস্থান থেকে অবৈধভাবে আমদানি করে বিভিন্ন ওষুধের দোকানসহ গোখাদ্য বিত্রেক্রতাদের দোকানে বিক্রি করা হচ্ছে। ওই সময়ের মধ্যে এসব গরু বিক্রি করতে না পারলে গরু হার্ট অ্যাটাক করে। চিকিৎসকরা জানান, এ ধরনের গরুর মাংস খাওয়া মানবদেহে সরাসরি ক্ষতিকর স্বেদ্বরয়েডের প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। এ মাংস গ্রহণের ফলে দুর্বল লিভার ও কিডনি রোগীর সঙ্কটাপন্ন অবস্থা তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ফ্রিজে রেখে এ বিষাক্ত মাংস খেলে সুস্থ মানুষকেও অসুস্থ করে তুলতে পারে বলে তারা মত দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলের সদস্য অধ্যাপক ডা. মাহবুব আলী খান বলেন, আমাদের দেশে সাধারণত বিত্রক্রয়যোগ্য গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ কাজে ¯স্বেদ্বরয়েড আইটেমের ডেক্সামেথাজন গ্রুপের বিভিন্ন ইনজেকশন প্রয়োগ হয়ে থাকে। এ ছাড়া ইউরিয়া খাওয়ানো হয়। মুখেও বিভিন্ন ধরনের উচ্চমাত্রার ভিটামিনের মিশ্রণ খাওয়ানো হয়। কোরবানির আগে এ প্রবণতা বেড়ে যায় জানিয়ে তিনি বলেন, স্বেদ্বরয়েড আগুনের তাপেও নষ্ট হয় না।

বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, যেসব ওষুধ গরুকে খাওয়ানোর জন্যে গরু বেপারীরা কেনেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে নোভিটা গ্র“পের এডাম-৩৩ এবং ওরাডেক্সেন। ডেল্কল্টা ফার্মা, রেনেটা ও অপসোনিন কোক্সানির ডেকাট্রন বিক্রি হয় বেশি। বিক্রেতারা জানান, মানুষের শরীরে ব্যবহারের জন্যে এসব ট্যাবলেট কিনে নিয়ে ব্যাপারীরা গরুকে খাওয়ায় দ্রুত মোটাতাজা করারর জন্য। একটি ট্যাবলেটের দাম পড়ে ১ টাকা। প্রেসত্রিক্রপশন ছাড়া এসব ওষুধ বিক্রির নিয়ম না থাকলেও বিক্রি হচ্ছে দেদারছে।

প্রাণী সম্পদ অধিদফতরের সহকারি পরিচালক ডা. ইকবাল কবীর এ প্রতিবেদককে বলেন, গরুগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে উঠে এগুলো প্রাকৃতিকভাবে নয়, কৃত্রিমভাবে মোটা করে বাজারে তোলা হয়েছে। প্রাণিবিদরা বলছেন, প্রাকৃতিকভাবে শক্তি সামর্থের কোনো গরু যেমন তেজি ও গোয়ার প্রকৃতির হয় এই গরুগুলো ঠিক উল্কেল্টাভাবে ধীর ও শান্ত হয়ে থাকে। শরীরে ও আচরণে কোনো তেজি ভাবই দেখা যায় না।

স্বেদ্বরয়েড খাওয়ানো গরু চেনার উপায় কী- জানতে চাইলে প্রাণি সম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. বায়েজিদ মোড়ল সমকালকে বলেন, এসব গরু অসুস্থতার কারণে সবসময় নিরব থাকে। কৃত্রিমভাবে মোটা করা এসব গরুকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জবাই না করলে মারা যায়।

প্রাণী সম্পদ অধিদফতরের হিসাবে, গত বছর ঈদে ৫৭ লাখ পশু জবাই হয়েছিল, যার অধিকাংশই গরু। এ বছরও প্রায় একই পরিমাণ গরু কোরবানি হতে পারে বলে ধারণা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের।

 আলতাব হোসেন, সংবাদ কর্মী

scroll to top