‘প্রকৌশলগতভাবেই সবুজ নগর গড়ে তোলা সম্ভব’ -ড. সারোয়ার জাহান

saroar-sir-2.jpg

 ঢাকাকে সবুজ নগর হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এ জন্য পার্ক, সড়ক, বাড়িঘরসহ সব ধরনের অবকাঠামোকে যতটা সম্ভব সবুজে ঢেকে দিতে হবে। এটা সাধারণত দুভাবে করা যায়। একটি প্রাকৃতিক আর অন্যটি প্রকৌশল কলাকৌশলে বা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিস্টেম ডেভেপলপমেন্টের মাধ্যমে।

যেহেতু ঢাকার স্থান সংকুলান এবং অন্যান্য নানা কারণে প্রাকৃতিকভাবে সবুজায়ন সম্ভব নয়, তাই প্রকৌশলগতভাবেই আমাদের এগোতে হবে। সবুজবান্ধব অবকাঠামো ডিজাইনের মাধ্যমে সবুজ নগর গড়ে তোলা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলীসহ বিশেষজ্ঞরাই বের করতে পারেন কোথায় কোথায় সবুজায়নের সুযোগ রয়েছে। সড়কদ্বীপ, সড়কের দুধার, ফুটপাথ প্রভৃতি স্থানে গাছ লাগানো যেতে পারে।

বিশেষ করে ফুটপাথে গাছ লাগানো জরুরি কেননা ঢাকার ফুটপাতে গাছ না থাকায় পথচারীরা কোনো ছায়াই পায় না। প্রতিটি বাড়িতেই অল্প হলেও কিছু গাছ লাগানো প্রয়োজন। কোনো ভবন প্রাঙ্গণে যদি গাছ লাগানোর মতো জায়গা না থাকে, তবে রুফ টপ গার্ডেনিং করা যেতে পারে অথবা পুরো ছাদকে গ্রিনরুফ করা যায়। এ ছাড়া রাজধানীতে নেইবারহুড পার্ক, সিটি পার্ক ও রিজিওনাল পার্ক স্থাপন করে গাছের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব। খেলার মাঠের চারপাশেও গাছ লাগানো যেতে পারে।

saroar sirসবুজায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি জলাধার সংরক্ষণ। নদী, পুকুর, খাল ও জলাধারের পানি সংরক্ষণ করে মাটিকে ভেজা এবং জলবায়ুর সঠিক আর্দ্রতা বজায় রাখা সম্ভব। ফলে গ্রীষ্মেও গাছ বেঁচে থাকার রসদ পায়। কিন্তু যেহেতু এখন জলাধারের পরিমাণ অনেক কমে গেছে, তাই নতুন করে পুকুর খনন করা যেতে পারে। আর এর চারপাশে গাছ লাগানোর পাশাপাশি হাঁটাপথ তৈরি করা যেতে পারে। এগুলোর মধ্যে গ্রীষ্মে যেসব পুকুরের পানি শুকিয়ে যাবে, তখন সেখানে খেলাধুলাও করা যাবে। আবার বর্ষার অতিরিক্ত পানি স্যুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে বের করা যাবে। প্রতিটি ভবনে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং করা যেতে পারে। এসব কিছুই স্থপতি ও প্রকৌশলীরা তাঁদের ডিজাইনের মাধ্যমে করতে পারেন। এসব কার্যক্রমই সবুজ নগরায়ণে সহায়ক।

ইমারত নির্মাণ বিধিমালাতে (বিএনবিসি) খালি জায়গা রেখে ভবন নির্মাণের নির্দেশনা থাকলেও তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না আর মানলেও সেখানে উš§ুক্ত না রেখে কংক্রিটে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। এই খালি জায়গায় যে সবুজায়ন ও গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জের জন্য তা অনেকেরই অজানা। ফলে বৃষ্টির পানি ঢুকতে পারছে না। রাজধানীতে স্থাপনা নির্মাণে রাজউকের থেকে প্ল্যান পাস করাতে হয় কিন্তু অনেক সময় প্ল্যান অনুযায়ী কাজ হয় না।

স্থাপনাগুলো যেন পাসকৃত ডিজাইন অনুয়ায়ী নির্মিত হয়, সে বিষয়ে কঠোর মনিটরিং করতে হবে। এর চেয়ে জরুরি সবুজ নগর গড়তে মানুষের মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করা। যখন বাড়িতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ঢুকবে এসি ও অতিরিক্ত বাতি ব্যবহার করতে হবে না, তখন মানুষ গাছপালার উপকারিতা বুঝতে পারবে। যত বেশি গাছ থাকবে, তত বেশি তাপ শোষণ করায় আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষা পাব। এ ব্যাপারে নগর পরিকল্পনাবিদদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এনজিও, পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর এ ধরনের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকারসহ সব প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, মানুষকে সচেতন হতে হবে।

ড. সারোয়ার জাহান, অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, বুয়েট

DSC_1248

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন:

মাহফুজ ফারুক, পরিবেশ ও স্থাপত্য বিষয়ক সাংবাদিক

scroll to top