আমরা শক্তি,আমরা বল,আমরা সবুজ দল!

1619323_808560975827197_1548760573_n.jpg

ঢাকা;৫ জুন:  অতি সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে শুরু করি। ২৯ মে বারিধারার একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে যখন উপস্থিত হয়েছি, তখন শ-দেড়েক শিক্ষার্থী নিবিষ্ট মনোযোগে বক্তব্য শুনছে সিহাব সামিরের। শিহাব কে সেটা পরে বলছি, আগে জানিয়ে রাখি এই দেড়শতাধিক শিক্ষার্থী, তারা এসেছেন ঢাকা আর ঢাকার বাইরের ১৪টি জেলা থেকে। ন্যাশনাল আর্থ অলিম্পিয়ার্ড এর দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষন আর পরিবেশ বিষয়ে উদ্ভাবনের সেরা বাছাই মনোনীত করার দিন ছিল এটি। এরা সবাই স্কুলের শির্ক্ষাথী। প্রত্যেকেই পরিবেশ সুরক্ষার জন্যে চিন্তা করছে, নিজেদের সম্পৃক্ত করছে। ভবিষ্যতে এরাই তো বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে। এবার বলি,সামিরের কথা। সামির এসব ভবিষ্যত পরিবেশ নেতাদের সমন্বয় করছে বাংলাদেশ ইউথ এনভারমেন্টাল ইনিশিয়েটিভ-বিওয়াইইআই এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে উজ্জীবিত করছে অনেক দিন ধরে।

৩ দিন আগে ধানমন্ডির নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী নিজেদের তোলা চাঁদার টাকায় ধানমন্ডি লেকে গাছ রোপন করবে বলে একতাবদ্ধ হচ্ছে বলে সংবাদ শুনেছি। শুনেছি তারা আজিমপুর এলাকার সরকারী আবাসিল এলাকায় ফাকা জায়গাগুলিতে ফলজ গাছ লাগিয়ে একটি মডেল সবুজায়ন এলাকা তৈরী করতে চান। এরা যখন পরিকল্পনা করছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী একটি এনভারমেন্টাল ক্লাবের ব্যানারে বুড়ীগঙ্গায় গিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান সম্পন্ন করেছে মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে।

স্টেট ইউনিভার্সিটি আর ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে ২ দিন যাবার সুযোগ হয়েছে। তারা পরিবেশ সাংবাদিকতা শেখার আড়ালে পরিবেশ বিষয়ে সচেতন করছে তাদের শিক্ষার্থীদের।আরো ১ সপ্তাহ আগে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাথী ফৌজিয়া রিনি-র ফোন, ভাইয়া আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেচার কনজারভেশন ইনিশিয়েটিভ-থেকে পরিবেশ মেলা করবো ২৪ মে। আপনাকে দা্ওয়াত। কিংবা আদিব খন্দকার রাতুল, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্বিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের ছাত্র সে এবং তার আরো ২ বন্ধু মিলিয়ে একটি অনলাইন ম্যাগাজিন চালাচ্ছে বহুদিন ধরে,যার আদ্যপান্ত-ই হলো পরিবেশ বিষয়ে বিতর্ক আর সচেতনতা।

কেন এই উদাহারন গুলো দিচ্ছি? এই সকল কথা বলছি আমার সাম্প্রতিক জানার পরিধি থেকেই। আর পূর্বের জানার পরিধি গুলো যদি একটু একটু করে বলি তবে পাতা পরিপূর্ন হয়ে যাবে। ৭১ টিভির প্রকৃতি প্রতিবেদক হোসেন সোহেলের নিরলস প্ররিশ্রম, বণ্যপ্রানী আর প্রকৃতির সুরক্ষা নিয়ে। জঙ্গলবাড়ি নামক তার এক প্রকৃতি পর্যবেক্ষনের উদ্যোগ আছে। যার মাধ্যমে পাচ তারা হোটেল নয়, বরং প্রকৃতি দেখার জন্য প্রকৃতির মাঝেই থাকা-খা্ওয়ার চর্চা শুরু করেছে সে এবং তার দল।

গনমাধ্যমকে এমন ভাবে ব্যবহার করে কাজে স্বীকৃতি পেয়েছেন এটিএন বাংলার প্রযোজক জিল্লুর রহমান। এ বছরই তিনি নিউইয়র্ক থেকে জাতিসংঘ মহাসচিবের হাত থেকে সেরা কাজের পুরষ্কার নিয়েছেন। আমার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকের বুন্ধু তালিকায় থাকা শেখ রোকন, সাংবাদিকতার পাশাপাশি নিরলশ কাজ করে যাচ্ছেন নদী বাচানোর জন্য। রিভারাইন পিপল নামের একটি সংগঠন চালায় সে। তা্ওহিদ হোসেন নামের আরো এক বন্ধু এনভারমেন্টমুভ.কম নামের একটি অনলাইন চালু রেখেছেন অনেকদিন। সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু অনিমেশ ঘোষ অয়ন, সেখানকার গ্রীন এক্সোপ্লোর সোসাইটি নামের সংগঠন পরিচালনা করেন।তাদের উদ্যোগে সম্প্রতি সিলেটের রাতারগুল উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাতিলের দাবীতে অবস্থান ধর্মঘট হয়েছে,কাজ ও বন্ধ হয়েছে সাময়িক ভাবে।

6

সহকর্মী সৈয়দ সাইফুল আলমের কথাটি না বললেই নয়। আমার দেখা সেই সম্ভবত গুটিকয়েক মানুষের এক জন,যে দিন রাত বন্ধুত্ব করে প্রকৃতির সাথে। টানা কয়েকমাস খেটে তুরাগ দখলের বিরুদ্ধে জনমত তৈরী শুধু নয়, প্রমানাদি ছবি সহকারে বানিয়ে পরিবেশ মন্ত্রনালয়ে জমা দিয়ে আসার কাজ করেছে সে। সম্প্রতি তুরাগের উচ্ছেদ অভিযান,তারই নিরলস পরিশ্রমের ফসল বলবো আমি। আর এর বাইরে কারা পুকুর দখল করলো, ধামমন্ডি মাঠের নির্মান বন্ধ হলো কি হলো না যাবতীয় কাজে প্রথম সারির মানুষ শোভন।

এবার থামবো। লিখতে লিখতে পাতা ভরে যাবে। কেননা, দেশব্যাপী এমন শোভন, রিনি, রাতুল, সামির, অয়ন, রোকনদের সংখ্যা বাড়ছে খুব দ্রুত গতিতে। এক নিরব বিপ্লবের জন্য প্রস্তৃত হচ্ছে আমাদের তারুণ্য।

এই যখন মাঠে প্রচারাভিযানে চিত্র তখন যারা মাঠে নামতে পারছেনা অথচ সবুজে ভুমিকা রাখার জন্য কাজ করছে উদ্যোক্তা হ্ওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তাদের কথা কি অনুচ্চারিরত থেকে যাবে? সপ্তাহ দুয়েক আগে ৩ দিন ব্যাপী উদ্যোক্তা প্রস্তুতির এক কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে আবিষ্কার করলাম, পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে যারা সবে মাত্র কিছু একটা করবো করবো ভাবছে অর্থাৎ উদ্যিোক্তা হ্ওয়ার বাসরা তৈরী করছে তাদের মধ্যে সবুজ উদ্ভাবনী নানা চিন্তার উন্মেষ ঘটছে।

1511631_655289927853223_6477112421473260557_o

বাংলাদেশ স্টার্ট আপ কাপ নামের এই উদ্যোক্তা সম্মিলনের মূল উদ্দেশ্য, যারা নিজ থেকে ব্যবসা বা উদ্ভাবনী মেধা কাজে লাগাতে চান,তাদের কে যথাযত প্রক্রিয়া সর্ম্পকে ধারণা দেয়া,যেন ভবিষ্যতে তারা একেকজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। ‘টিম ওয়াটার পিউরিফায়ার’ ভাবনা ছিল পানির সমস্যা সমাধান এবং সুমূল্যে গ্রামের জনসাধারণের জন্য সুপেয় পানির নিশ্চয়তা প্রদান। তাদের দলনেতা বলেন যে তারা এমন কিছু করতে চায় যা শুধু ব্যবসায়িক পরিকল্পনাই হবে না, এমনকি সামাজিক কারণও থাকবে। একটি আকর্ষণীয় ভাবনা পেশ করেছিল ‘টিম এগ্রেট’। তারা সবুজের মূল্যায়ন এবং কাগজের ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতার কথা বলেছে। তারা দেখিয়েছে কিভাবে কাগজের পরিবর্তে একজন নারী বৈদ্যুতিক শুভেচ্ছা কার্ড ব্যাবহার করেছে। এই একটি ভাবনা গাছের উপর থেকে অনেকখানি বোঝা নামিয়ে নিতে পারে। আরো একজন উদ্যোক্তা পরিবেশ সুরক্ষার ভাবনা থেকে সিগারেট এর উচ্ছিষ্ট অংশ সংরক্ষন করে কিভাবে ইটের ভাটায় জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা এবং পকেটে রাখার মত ছাইদানী নির্মানের ফর্মূলা দেন। এভাবে তরুনদের ভাবনায়, সবুজ বানিজ্যের নানামুখি ভাবনায় প্রসারিত হচ্ছিল, ৩দিন ব্যাপী কর্মশালার প্রতিটি দিন।

আর সাজিদ ইকবালের মত উদ্যোক্তারা তো আগে থেকেই মাঠে। বোতলের ভিতর সুর্যের আলো ঢুকিয়ে বস্তি আর নিন্ম আয়ের মানুষের অন্ধকার ঘরকে কিভাবে আলোকিত রাখা যায় তার মডেল প্রচলন করে আগেই সুক্ষ্যাতি অর্জন করেছে। এখন জার্মান অর্থায়নে কিভাবে দরিদ্রদের কমমূল্যে সৌরবাতি দেয়া যায় তার জন্য কাজ করছে।

এই যে সবুজের জন্য প্রচারাভিযান, উদ্ভাবন, গবেষনা, সেবা, সবুজ নির্মান, সবুজ ভ্রমন, সবুজ উদ্যোগে একটিু একটু করে ব্যস্থ হয়ে পড়ছে আগামীর তরুণের। সবাই কি পয়সার জন্য করছে? না। দায়িত্ববোধ থেকে করছে।

 ধানমন্ডি থানা পর্যন্ত এলাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি আর্থ কেয়ার ক্লাব

ধানমন্ডি থানা পর্যন্ত এলাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি আর্থ কেয়ার ক্লাব

একসময় পরিবেশবাদী বলে একটা শব্দ-হয়তো এখনো অনেকেই মনে করেন,পরিবেশবাদী একটি আলাদা জাত। গুটি কয়েক সমাজের শিক্ষিত ব্যাক্তি যারা সবকিছুর বিরোধিতা করেন,তারাই মূলত পরিবেশ বাদী। এই পরিবেশবাদীদের সম্পর্কে এখন তরুনদের ধারণা পাল্টাচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন আমাদের সবাইর একমাত্র কাঙ্খিত চা্ওয়া। সেই উন্নয়নের বর্তমান যে গতি তা যদি অব্যহত থাকে, তাহলে আগামী ৩ দশকের মধ্যে, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর ভন্ডামি যতই থাকুক, এই দেশ কোন অংশেই সিঙ্গাপুর, মালয়শিয়া বা দক্ষিন কোরিয়ার চেয়ে পেছনে থাকবে না। কারণ ইতিমধ্যে সেই পথেই রওনা দিয়েছি আমরা। উন্নয়নের দৌড়েই আছি আমরা। কিন্ত সংশয়ের জায়গাটা হলো উন্নয়নের সাথে সবুজের সমন্বয় সাধন না হলে সে উন্নয়ন গলার ফাস হিসেবে পরিগনিত হয়। সেই গলার ফাস যেন আমাদের না লাগে, উন্নয়ন যেন যুগোপোযোগী হয়, পরিবেশের সুরক্ষার সাথেই হয়,যেখানে জীব বৈচিত্র সুরক্ষিত থাকবে, আগামী প্রজন্ম প্রকৃতির সংমিশ্রনেই বড় হবে সে জন্যেই উন্নয়নের চাকাকে সঠিক লাইনে নিতে দরকার উদ্যমী নেতৃত্ব। যাদের কথা বললাম,তারাই সেই কাঙ্খিত দেশ নেতার জন্য বড় হচ্ছে, আর এরা সবাই পরিবেশ বাদী।

 ভাবুন তো একটি দেশে যদি এমন ১ কোটি মানুষ পরিবেশ বাদীহয়ে বড় হয়,তাহলে সেই দেশের টেকসই উন্নয়ন হবে না তো কি উগান্ডার হবে? উন্নয়নে সবুজের সমন্বয়, পরিকল্পনায় প্রকৃতির দায় নিশ্চিত করতে তারুণ্যই আসল শক্তি। আমরা শক্তি, আমরা বল, আমরা সবুজ দল!  তারুন্যের জয় হোক, সবুজের অগ্রগতি অটুট থাকুক।

সাহেদ আলম। সম্পাদক, সবুজপাতা নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top