নদীর পিলার: নদী রক্ষার জন্য, নাকি নদী মেরে ফেলার জন্য?

1265219_726678307372147_8074782023480364278_o.jpg

নদীর পিলার: নদী রক্ষার জন্য, নাকি নদী মেরে ফেলার জন্য?

ঢাকা: তুরাগ। যেন এক বালির রাজ্য। দখলদারদের সহায়ক হয়ে চারিদিক থেকে বালি আর বালির এগিয়ে আসছে। এ যেন এক মরুভূমি। সবুজ তুরাগের পাড় ক্রমেই দখলদারেদের থাবায় ধূসর মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। যদি ভাবি হুমকির মুখে পড়ছে শুধু এই রাখাল আর গরুগুলো ভবিষ্যৎ। তবে ভুল ভেবেছি। এই দখলদার আপনার আমার সকলের জীবন বিপন্ন করে ছাড়বে। রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে চলছে দখলের মহোৎসব। যে যেখানে যেভাবে পারছে নদী ভরাট করে স্থাপনা গড়ে তুলছে। সরকারি জমি দখল করে চলছে জমজমাট প্লট বাণিজ্য। সেই সঙ্গে চলছে নদী দূষণ। সব মিলিয়ে নদী রক্ষার দায় যেন কারো নেই।

তুরাগ দখল

২০০৪ সালের ১১ ডিসেম্বর গুগলের স্যাটেলাইট ছবি অনুযায়ী, তুরাগ ব্রিজের ১৩০ মিটার পশ্চিমে তখন নদী প্রায় ৫৭ মিটার প্রশস্ত ছিল। কিন্তু একই স্থানে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির চিত্রে দেখা যায়, তা ১৭ মিটার প্রস্থে দাঁড়িয়েছে।আর পত্র-পত্রিকার অনুসন্ধানী খবরে হরহামেশাই বলা হচ্ছে, তুরাগ দখলে জড়িতদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, সরকারি আমলা, সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, অসাধু ব্যবসায়ী। কতিপয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও দখলদারিত্বের অভিযোগ রয়েছে। তুরাগ নদের ১০৯টি স্থানে কমবেশি অর্ধসহস্রাধিক দখলদার প্রকাশ্যে দখলযজ্ঞ চালাচ্ছে। শতাধিক হাউজিং কোম্পানি তুরাগ ভরাট করে প্লট ও ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রি করছে। আর এ সবই সম্ভব হয়েছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন, ভূমি জরিপ অধিদফতর এবং বিআইডব্লিউটিএ’র নদী রক্ষায় সীমানা পিলার স্থাপনে ভুল ও অনিয়মের সুযোগে।

  dhaka38

নদীর সীমানা পিলার!

বিতর্কিত সীমানা খুঁটির কারণে তুরাগ নদের প্রায় দেড় হাজার একর জমি বেহাত হয়ে গেছে। বেহাত হওয়া জমির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। সীমানা নির্ধারণ করে খুঁটি বসানো নিয়েও শতকোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতকিছুর পরও সীমানা পিলার গায়েব করে তুরাগ দখলের হিড়িক পড়েছে। পেশিশক্তি ও টাকার জোরে নদী খেকোরা সরকারি এক নং খাস খতিয়ান জালিয়াতি করে শত শত একর জায়গা নিজেদের নামে মাঠ পর্চাসহ রেকর্ড করে নিয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠন পবা, বাপা ও বিআইডব্লিউটিএ’র জরিপ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

সীমানার ২শ’ গজের মধ্যে কোন স্থাপনা তৈরি না করার নিয়ম থাকলেও তুরাগ নদের দুই তীরে প্রায় অর্ধশতাধিক ডায়িং কারখানা, হাউজিং প্রতিষ্ঠান, প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজ ও বিভিন্ন সংগঠনের নামে তীরবর্তী জায়গা দখল করে বাউন্ডারি তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সীমানা নির্ধারণে ব্রিটিশ আমলের জরিপ এড়িয়ে সামপ্রতিক জরিপকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাবে এবং উেকাচের বিনিময়েও ভুলভাবে সীমানা পিলার বসানো হয়েছে। হাইকোর্ট ২০০৯ সালের ২৫ জুন সিএস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) পদ্ধতি অনুসারে আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসে (বর্ষাকাল) নদীর ঢাল থেকে ১৫০ ফুট দূরে সীমানা খুঁটি বসানোর নির্দেশ দিয়েছে। সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। ফলে নদীর বিপুল পরিমাণ জায়গা বেদখল হয়ে গেছে।

 বাপার সাধারণ সম্পাদক ডা. আবদুল মতিন  এর ভাষ্য অনুযায়ী, তুরাগ নদের ১৫ কিলোমিটার অংশে ভুলভাবে প্রায় আড়াই হাজার সীমানা খুঁটি পোঁতা হয়েছে। অথচ এর মধ্যে মাত্র ২৯টি পিলার সঠিক স্থানে পেয়েছে বাপার পরিদর্শন টিম। যদিও ইতিমধ্যে একাধিক পিলার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, হাইকোর্ট নির্ধারিত নদীর সংজ্ঞাকে অবজ্ঞা করে জেলা প্রশাসন নিজস্ব বিবেচনায় শুষ্ক সময়ের নদীর তলাকে ‘নদী’ ধরে নিয়ে তুরাগের বুকের মধ্যেই খুঁটি বসিয়েছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, খুঁটিগুলোর অধিকাংশই নদীর মূল সীমানা ও নকশা মেনে এবং হাইকোর্টের রায় অনুসারে বসানো হয়নি। পিলার বসানোর সময় গঠিত টাস্কফোর্সের সদস্যদের মধ্যেও নদীর প্রকৃত সীমানা নিয়ে কয়েক দফা বিরোধ হয়েছিল।

সবুজপাতা প্রতিবেদন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

scroll to top