গাবুরা : সুন্দরবনের পাদদেশে ধূষর এক জনপদ?

750545-bangladeshi.jpg

বাংলাদেশের সবচে বড় সবুজের অরণ্য সুন্দরবন-ঠিক গাবুর উল্টোদিকে। প্রদীপের নিচে যেমন অন্ধকার থাকে তেমনি,সবুজের পাদদেশের এক ধুষর জনপদ গাবুরা ইউনিয়ন

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ-ইউনিয়ন গাবুরা। দুইপাশে খোলপেটুয়া, একপাশে কপোতাক্ষ নদ। নদী দুটির মাঝে সংযোগ করেছে চৌদ্দরশি খাল। বাংলাদেশের সবচে বড় সবুজের অরণ্য সুন্দরবন-ঠিক গাবুর উল্টোদিকে। প্রদীপের নিচে যেমন অন্ধকার থাকে তেমনি,সবুজের পাদদেশের এক ধুষর জনপদ গাবুরা ইউনিয়ন।

‘আইলা’র সময় বেড়ীবাঁধ ভেঙ্গে পুরো ইউনিয়নটিতেই ঢুকে পড়েছিল লবণ পানি। বেড়ীবাঁধটি এতটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল যে পুনরায় নির্মাণ করতে প্রায় দু’বছর লাগে। এই দুই বছর পুরো এলাকাটিই জোয়ারের পানিতে প্লাবিত ছিল। আগে এই জায়গাটি ছিল সবুজ অরণ্যে ঘেরা। কিন্তু এখন সেই গাছপালা নেই। সেই ভয়াবহতার প্রভাব থেকে এখানকার মানুষ এখনো মুক্ত নয়। দীর্ঘদিন লোণা পানি জমে থাকায় জমিগুলো সব লবণাক্ত হয়ে গেছে। পড়ে আছে বিরাণ ভূমি। নতুন করে গাছ লাগালেও লবণাক্ততার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জমিতে ফসল নেই, দেখা দিয়েছে খাদ্য ঘাটতি।
20130520_185332.jpg_460
সারা দেশে যখন দারিদ্রের হার ধীরে ধীরে কমছে, তখন এখানে অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৬ সালে এই এলাকাগুলোতে দারিদ্রের হার ছিল মাত্র ১১শতাংশ। আর ২০০৮ সালে তা বেড়ে ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই হার আরো বাড়ছে। ফলে দারিদ্র এখানে নতুন মাত্রা নিচ্ছে।

কাজের খোঁজে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে এখানকার মানুষ। দিনমজুর শ্রেণীর মানুষেরা সংলগ্ন সুন্দরবন কেন্দ্রিক জীবিকা নির্বাহ করতো। কাঠ, গোলপাতা, রেণুপোণা কিংবা কাঁকড়া শিকার করে চালাতো তাদের জীবন। কিন্তু নানাভাবে খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা অনেকাংশেই বিপন্ন করে তুলেছে জলবায়ূ পরিবর্তন এবং সর্বনাশা চিংড়ি চাষ।

সুপেয় পানির অভাব এখানে প্রকট। চারিদিকেই পানি, পানের জন্য নেই একফোঁটাও। সামান্য খাবার পানিই অনেক দূরের অধরা বস্তু। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোন প্রকার খাদ্য গ্রহণ না করে মানুষ সাধারণত ৫০দিন পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কিন্তু পানি ছাড়া ৫দিনও বাঁচতে পারেনা। কিন্তু গাবুরার মানুষজন কিভাবে বাঁচে!

ধনাঢ্যরা প্রায় ৬/৭ কিমি দূরে থেকে ব্যয়বহুল পাইপ ওয়াটার ব্যবহার করছে। যাদের সাধ্য নেই তারা বাধ্য হচ্ছে জলাধারের ফিল্টারকৃত পানি ব্যবহার করতে। সে পানিও আনতে কয়েক ক্রোশ দূরে যেতে হয়। কিন্তু অসচেতনতার কারণে সংরক্ষিত জলাধারের পানি বিভিন্নভাবে দূষিত করছে মানূষ। ফলে বাড়ছে রোগ ব্যাধির সংক্রমন। ভূগর্ভস্থ পানিতে শুধু লবণাক্ততাই নয় বাড়ছে আর্সনিক দূষনের প্রকোপ।

বৃষ্টির মৌসুমে বৃষ্টির পানি হার্ভেষ্ট করে রাখা হয়। সংসারের হাঁড়ি-পাতিল আর পানির পাত্র ভরে রেখে সেই পানিতে কিছুটা তৃষ্ণা মিটে গাবুরাবাসীর। কিন্তু সেটাও তো খুবই অপ্রতুল। রেইন ওয়াটার হার্ভেষ্টের জন্য নেই কোন স্থায়ী ব্যবস্থাও।

সংকটের কারণে এলাকায় পানি রেশনিং হচ্ছে। অথচ ১০ বছর এই এলাকার লোকজন ভাবেনি শহরের মতো তাদেরকেও চড়া মূল্যে পানি কিনতে হবে। এই অঞ্চলে গো-খাদ্যের অভাবে মানুষ গবাদী পশু পালন ছেড়েই দিয়েছে। আবাসস্থলের অভাবে হারিয়ে গিয়েছে অনেক প্রজাতির পাখি। প্রাকৃতিক উৎসে মাছের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই প্রায় ৬০ প্রজাতির স্বাদু পানির মাছ এখান থেকে হারিয়ে গেছে। কৃষি জমিগুলো দীর্ঘদিন লবন পানিতে আটকে থাকায় মাটি তার উর্বরতা হারাচ্ছে ফলে খাদ্য সংকট আরো ঘনীভূত হয়ে পড়ছে।

উপকূল: পেছন ফিরে দেখা

বাংলাদেশের দক্ষিন-পশ্চিমে উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরা। বিশ্ব ঐতিহ্যের সুন্দরবন। রহস্যে-ঘেরা জীব-বৈচিত্র, গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ, সব মিলিয়ে সোনালী সুখ ছিল এই অঞ্চলে। ষাটের দশকে ওয়াপদার বেড়ীবাঁধ নির্মাণের পর সবুজ গাছপালায় এ অঞ্চল ছিল একটি মিনি অরণ্যের মতো। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত খাদ্যশষ্য সরবরাহ করা হতো এখান থেকে। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন পট পরিবর্তন হতে থাকলো। বদলে গেলো এখানকার পরিবেশ।

৮০’র দশকে কৃষিজমিতে শুরু হলো চিংড়ির চাষ। আবাদী জমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকিয়ে তৈরি হলো চিংড়ি ঘের। একরের পর একর জমি হলো লবণাক্ত। জোতদাররা পেলো কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। বিপাকে পড়লো দরিদ্র শ্রেনীর মানুষ। কৃষিজমিতে যে পরিমান শ্রম দরকার হতো চিংড়ির ঘেরে সেই শ্রম প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেলো। ফলে- মানুষ হতে থাকলো কর্মহীণ। বেড়ে গেলো দারিদ্রের হার। ভূমিহীন আর দিনমজুররা ভুলে গেলো সোঁদা মাটির গন্ধ। সবুজ ফসলের ক্ষেতে বাতাসের দোল স্বপ্ন হয়ে রইলো কৃষকের চোখে। মাটি হারালো ফসল উদ্ভাবনী শক্তি। চিংড়ি ঘের হলো মানুষের জন্য মরন ফাঁদ।
Bangladesh Climate Change
তবুও, খুলনা ও সাতক্ষীরার প্রায় দেড় লক্ষ হেক্টর জমিতে লবণ পানির চিংড়ি চাষ হচ্ছে এখনও। মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ মানুষসৃষ্ট। অধিক মুনাফা আর লোভের বশবর্তী হয়ে মানুষ করে চলেছে এই সর্বনাশ। আবাদী বা কৃষিজমিতে চিংড়ি চাষ করে মানুষ সেই প্রতিকূলতাকে ত্বরান্বিত করে চলেছে। প্রভাবশালীরা হেক্টরের পর হেক্টর কৃষিজমিকে চিংড়ি ঘেরে পরিণত করেছে। এখানে চিংড়ি চাষ এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, ঐতিহ্যবাহী কৃষি পেশা প্রায় বিলুপ্তির পথে। অপরদিকে একই জমিতে দীর্ঘদিন ধরে চিংড়ি চাষের ফলে মাটি ও পানির গুণাগুন নষ্ট হয়ে চিংড়িতে নানা ধরনের ভাইরাস এবং রোগ ব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে চিংড়ি চাষীদের। শুধু মাটিতেই নয় ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধিতেও এগুলোই দায়ী। বর্তমানে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ১০লাখ হেক্টর জমি লবণাক্ততার কারণে ফসলচাষের অনুপোযুক্ত। আগামীতে এর পরিমান আরো বাড়ার সম্ভবনা রয়েছে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জলবায়ূ পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশ হিসাবে এখন বাংলাদেশকে বিবেচনা করা হয়। সমূদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আর ১০০সেমি বাড়লেই উপকূলের প্রায় ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ জমি পানির নীচে তলিয়ে যাবে। শরনার্থী হবে প্রায় দুই কোটি মানুষ। ইতিমধ্যেই চরম হুমকির মুখে পড়েছে খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীববৈচিত্র। যার অংশ হিসেবে ছোট্ট দ্বীপ-ইউনিয়ন গাবুরা ইতিমধ্যেই সংকটের গভীরে হাবুডুবু খাচ্ছে।

305731_2406161595677_1787445_n
জিল্লুর রহমান, ম্যানেজার (অনুষ্ঠান), এটিএন বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© 2016 CompanyName. All rights reserved.
Optional footer notes.
scroll to top