Homeসবুজ বিতর্কসবুজ পাহাড়ে কালো দাগ

সবুজ পাহাড়ে কালো দাগ

রাজীব মীর, সহযোগী অধ্যাপক সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

CTG-Hill-Tract

তাইন্দং। মাটিরাঙ্গা, খাগড়াছড়ি : অনেকগুলো আদিবাসী পাড়ার সহজ মানুষ সবুজ পাহাড়ে প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান ও সংগ্রাম করে মাঠে ফসল ফলিয়ে এখানে জীবিকা নির্বাহ করে। সেই তাইন্দং এর  সবুজ মাটিতে আজ কালো দাগ, প্রাণচ ল এলাকাটি আতংক এবং ভয়ে আজ শামুকের মত নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। বাজারে ক্রেতা বিক্রেতার ভূমিকায় তারা নেই, নেই স্কুলের শিক্ষার্থী হিসেবে। পায়ের নিচে মাটি নেই। মাথার উপর নেই ছায়া, ঘর কিংবা আশ্রয়। আবার আক্রান্ত হবার ভয়। অনিরাপত্তার আশংকা। এই নিয়ে তাদের বেঁচে থাকা।  কারন, আর কিছু না। নিজ দেশের ভিন্ন সংস্কৃতির সশস্ত্র হামলা ও তান্ডব ।

৩রা আগস্ট ২০১৩, বিকাল তিনটা। তাইন্দং এর ১৩ জুম্ম অধিবাসী পাড়ায় সেটলার বাঙালিদের সংঘবদ্ধ সাম্প্রদায়িক হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট। প্রেক্ষাপট গতানুগতিক অপপ্রচার এবং গুজব। কামাল হোসেন নামের একজন সেটলার বাঙালি আদিবাসী কর্তৃক অপহৃত। ব্যস, সকল বাঙালি সংঘবদ্ধ হয়ে সাম্প্রদায়িক শ্লোগানের মাধ্যমে লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে নিরীহ পাহাড়িদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে, ৩৪ টি বাড়ি জ্বালিয়ে ছাইভস্ম করে। ২৫৯ পরিবার তছনছ করে সকল সম্পদ লুট করে, আর প্রাণভয়ে পালানো খালি ঘরবাড়িসহ ক্ষতিগ্রস্থ হয়  মোট ৯০২ পরিবার।  এবং জনসেবা বৌদ্ধ মন্দির আক্রমণ করে মূর্তি চুরি করে ও ভেঙ্গে দেয়।
হামলা থেকে প্রাণ বাচাতে ১২টি গ্রামের তিন হাজার পাহাড়ি বাড়িঘর ছেড়ে ভারত সীমান্তে, পানছড়ি উপজেলায় এবং বনে-জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। ঘটনার পর সরকার ও বিজিবির দেয়া ক্ষতিপূরণ ও জানমালের নিরাপত্তার আশ্বাসের ভিত্তিতে পালিয়ে যাওয়া পাহাড়িরা বর্তমানে নিজ গ্রামে ফিরে আসলেও তাদের  সঠিক পুর্নবাসনএবং উপযুক্ত ত্রাণ প্রায় উপেক্ষিত এবং অপ্রতুল। কিছু পরিবারকে দুই কিস্তিতে মোট ১৬ হাজার পাচশত টাকা, ঢেউটিন ২০ কেজি চাল, ত্রিপলের ব্যবস্থা করা হলেও ক্ষতিগ্রস্থ পাহাড়িরা বর্তমানে খোলা আকাশে নিচে অর্ধাহারে অনাহারে, রোগে শোকে ভুগে দিন যাপন করছে। গৃহহীন হওয়ায় বৃষ্টির পানিতে ভিজে দুই মাস বয়সী আশামনি চাকমা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।  উল্লেখ্য, বৌদ্ধ মন্দিরের ধ¦ংসযজ্ঞ, বৌদ্ধমূর্তি চুরি এবং আশামনি চাকমার এই ধরণের মৃত্যু বিষয়ক কোনো মামলা থানা গ্রাহ্য করেনি, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার জন্যই মামলা হিসেবে না  নিয়ে  উভয় ক্ষেত্রেই তা জিডি হিসেবে অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে।

যদিও ঘরবাড়ি আগুনে পোড়ানো এব লুটপাট বিষয়ক মামলাটি থানা আমলে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসনের মতে, এ পর্যন্ত অভিযুক্ত ১২ জন বাঙালিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  এ বিষয়টি একটি তদন্ত কমিটিও হয়েছে। মজার বিষয় হল অপহরণের গুজব ছড়ানোর জন্য যে মোটরসাইকেল আরোহীর নাম প্রচার করা হয়েছিল সেই কামাল হোসেনকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে এটি যে পাহাড়িদের উপর হামলা করার জন্য পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র তা স্বীকার করেছে। ২৯ জুলাই থেকে হামলার আগের দিন পর্যন্ত তাইন্দং বাজারে তারা উগ্রসম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। ৩১ তারিখে সেটলারদের একটি মিছিল পাহাড়ি গ্রামের দিকে অগ্রসর হলে অনেকেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে আশ্রয় নেয় এবং মূল হামলাটি হয় আগস্টের ৩ তারিখ। কিন্তু স্থানীয় বিজিবি এ বিষয়ে প্রশ্নবোধক ভূমিকা রেখেছে বলে অনেকে মনে করেন। কারন হামলার  দিনে বিজিবির সমঝোতার ডাকে পাহাড়িরা ক্রসিং নামক স্থানে আসলে তাদের সামনেই সেটলার বাঙালিরা অপহরণ নাটকটি কেন্দ্র করে পাহাড়িদের মারধর করে, যেখানে তারা কোন ভূমিকা পালন করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

পাহাড়িদের উপর হামলা নতুন কোন বিষয় না। আবার তাদের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাসও দেয়া হয়েছে বহুবার। ১৯৮১ সালে বাঙালি সেটলার কর্তৃক ত্রিপুরাদের ১৯৮৬ সালে রামবাবু দেবা গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে। মৌখিক প্রতিশ্রুতি, ২০ দফা চুক্তি, এবং ১৯৯৭ এর পার্বত্য শান্তি চুক্তি কোনোটিই কারণে এসকল হামলা নিপীড়ন বন্ধ হয়নি। পাহাড়িদের জীবন থেকে সুখ শান্তি ও নিরাপত্তা কেড়ে নেয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে তারা নিজ ভূমিতে পরবাসী, নিরাপরাধ হয়েও কয়েদি ১৯৮১ ও ৮৬ সালের পর মাটিরাঙ্গার ৯০ ভাগ জমি বেদখল হয়েছে, যেখানে ২৪টি সেটলার বাঙালিদের গুচ্ছগ্রাম রয়েছে। মাটিরাঙা উপজেলায় বর্তমানে ৪১ হাজার বাঙালি ভোটার এবং ২৬ হাজার পাহাড়ি ভোটার রয়েছে।

মাটিরাঙ্গায় পাহাড়ি অধিবাসীর সংখ্যা উদ্বেগগজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। অতএব, এই সহিংস ভয়াবহ হামলার মূল উদ্দেশ্য পাহাড়িদের অবশিষ্ট  ১০ ভাগ জমির দখল নেয়া অর্থা ইচ্ছাকৃত সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে আদিবাসীদের তাড়িয়ে তাদের জায়গা জমি দখল করা। যা  অনাকঙ্খিত ও অত্যন্ত দুখজনক।

পর্যবেক্ষণ সমূহ নি¤œরূপ:
এভাবে বার বার হামলার ফলে আদিবাসীদের উদ্বাস্তু হয়ে ভারতীয় সীমান্তে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে যা প্রত্যেক বাংলাদেশির জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। উপরন্তু বৌদ্ধমূর্তি ভাঙা ও চুরি করা আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দীর্ঘদিনের গৌরবকে ম্লান করে দেয়।
একই দেশে বসবাস করে শুধু ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের পরিচয়ের কারণে সংখ্যালঘু হিসেবে তাদের উপর এ ধরনের নির্যাতন এবং যার ফলে যে মানসিক আতঙ্ক নিয়ে তাদের এখানে বসবাস করতে হচ্ছে তা আমাদের সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থি।
যেহেতু পাহাড়িদের ভূমি দখলের প্রক্রিয়া  এবং হামলা প্রকৃতি সময় ও স্থান ভেদে একই, তাই এই ঘটনার ক্ষেত্রেও গুজব বা প্রচারণা ছড়ানোর সাথে সাথেই এ বিষয়ে প্রশাসনিক তৎপরতা এবং আন্তরিকতা জরুরি ছল তা যথাসময়ে নেওয়া যায়ান বা হয়নি। ফলে এই ধরণের একটি ম্যাসিভ ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানো যায়নি। সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য এই এখানে হমালার পূর্বে বিভিন্ন মসজিদের মাইক ব্যবহার করে বাঙালিরা একত্রিত হয়েছিল এবং মসজিদেই সভা করেছিল। কাজেই ধর্মকে আশ্রয় করে এ ধরণের হামলা রাজনৈতিক মতাদর্শকেও অতিক্রম করছে বলে আমাদের পর্যবেক্ষণ। তাই এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ব্লেমগেইম মারাত্মকভাবে কাজ করে এবং অপরাধীরা আড়ালে চলে যায়।
বাজারে যাওয়ার পথে মারধরের ভয়ে উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে পারে না। শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না। আদিবাসী জুম্মদের মধ্যে স্থায়ী আতঙ্ক বিরাজ করে। যার ফলাফল আর কয়েক বছরের মধ্যে এই জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তি। যা মোটেই কাম্য নয়।
তাইন্দং এ হামলা সময় তানক্কাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং হাইস্কুলের শিক্ষক আবদুল আজিজ মাস্টার এবং সাহেব সরদার পাড়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মুক্তার হোসেন নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে স্পষ্ট অভিযোগ আছে। কাজেই এ বিষয়টি অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক প্রতীয়মান হয়েছে। যদিও
স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যেগে তাইন্দং এ একটি শান্তি সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। মজার বিষয় হলো সমাবেশের স্থান নির্ধারিত ছিল একটি মাদ্রাসা। যেখানে অধিকাংশ পাহাড়িরা উপস্থিত হতে পারেনি। এক্ষেত্রে পাহাড়ে নিয়োগকৃত প্রশাসনের কর্তব্যক্তিদের ‘মাইন্ড সেট আপ’ বিষয়েও ভাবা যেতে পারে।

কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্মদের জীবন জীবিকা সুরক্ষার স্বার্থে এবং তাইন্দং এ ক্ষতিগ্রস্থদের পূণবাসনের জন্য  সুপারিশ নিম্রূপ:

ক) সংযুক্ত ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের ক্ষতির পরিমাণ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রদান সহ তাদের ঘরবাড়ি পূননির্মান করে প্রত্যেক পাহাড়ি পরিবারকে যথাযথ পূনবাসন করা হোক।
খ) বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে হামলা ষড়যন্ত্রকারী, ইন্ধনদাতা ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহনকারীদেরকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হোক।
গ) বৌদ্ধ বিহার পূননির্মাণ, বৌদ্ধমূর্তি প্রতিস্থাপন এবং ভিক্ষুদের নিরাপত্তা প্রদান।
ঘ) পলিশকে সক্রিয় করে স্থানীয় নিরাপত্তা প্রশাসনের আন্তঃসমন্বয় জোরদার করা সহ বাঙালি ও আদিবাসীর মিশ্রণে পাহাড়ে মিশ্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হোক।
ঙ) সর্বোপরি পার্বত্য শান্তি চুক্তি অনুযায়ী ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ বর্তমান সংসদের মেয়াদকালীন সংশোধন করা হোক। মোদ্দা কথা পাহাড়ি বাঙালির শান্তির বিষয়টি রাজনৈতিক সমাধা হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

 

Rajib mir

রাজীব মীর, সহযোগী অধ্যাপক

সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

Late comments
  • I appreciate you sharing this article.Really thank you! Really Great.

  • “I have recently started a web site, the information you provide on this site has helped me greatly. Thanks for all of your time & work. В«Yield not to evils, but attack all the more boldly.В» by Virgil.”

  • I value the article.Thanks Again.

  • I am so grateful for your blog article. Really Cool.

  • “Wow, superb blog layout! How long have you ever been blogging for? you make running a blog look easy. The overall look of your web site is magnificent, let alone the content!”

  • Looking forward to reading more. Great blog post.Thanks Again. Awesome.

  • Hey, thanks for the article.Really looking forward to read more. Cool.

  • Appreciate you sharing, great article.Really thank you! Want more.

  • I truly appreciate this post. Cool.

  • A big thank you for your blog.Thanks Again. Really Cool.

  • I really like and appreciate your blog.Thanks Again. Fantastic.

  • Really informative article.Really thank you!

  • Thanks a lot for the article post.Really looking forward to read more.

leave a comment