Homeবন ও বণ্যপ্রানী‘শীতে ভোলায় ৬৬ প্রজাতির প্রায় ৫০ হাজার পাখির সন্ধান’

‘শীতে ভোলায় ৬৬ প্রজাতির প্রায় ৫০ হাজার পাখির সন্ধান’

 ভোলা  প্রতিনিধি:  শীতে বাংলাদেশের নানা জায়গায় অতিথি পাখির আগমন ঘটে। মূলত খাদ্যের প্রাপ্যতায় পাখিগুলো তাদের প্রয়োজন মত খাবার যেখানে পায় প্রতিবছর সেখানেই নতুন করে আসে পাখিরা। একেক জায়গায় একেক ধরনের শীতের পাখির প্রাধ্যান্য দেখা যায়। ভোলার প্রত্যন্ত অন্চলগুলোতে এবার ও এসেছে প্রচুর শীতের পাখি। বাংলাদেশের অন্যতম পাখি বিষরদ ইনাম আল হকের নেতৃত্বে এবার ও  পাখি গননা কার্যক্রম শুরু হয়েছে ভোলার চরান্চলে।

এ বছর শীত মৌসুমে ভোলায় ৬৬ প্রজাতির সর্বমোট ৫০ হাজার ৪০টি পাখি গণনা করা হয়েছে।

এ বছর শীত মৌসুমে ভোলায় ৬৬ প্রজাতির সর্বমোট ৫০ হাজার ৪০টি পাখি গণনা করা হয়েছে।

জানুয়ারীর ২০ তারিখ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত ৭ দিন ব্যাপী ভোলায় পাখি গণনার এক বিশেষ উদ্যোগে ৬৬ প্রজাতির প্রায় ৫০,০০০ পাখির সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন এই উদ্যোগের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা এভারেস্ট জয়ী বাংলাদেশী এম এ মুহিত। সবুজপাতার সাথে আলাপ কালে তিনি জানান, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারীতে জাহাঙ্গীর নগরে অনুষ্ঠিতব্য পাখি উৎসবে সেসব গণনা চিত্র প্রদর্শন করা হবে। ৭ দিন ব্যাপী এই কাজে যৌথ ভাবে অংশ নিয়েছিলেন,  পাখি পর্যবেক্ষক ইনাম আল হক,পর্বত আরোহী এমএ মুহিত, বন্যপ্রাণী গবেষক  সামিউল মোহসেনিন এবং প্রকৃতি পর্যবেক্ষক অনু তারেক।

ঢাকা থেকে ভোলায় জলপাখি গণনা করতে আসা আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন পাখি পর্যবেক্ষক ইনাম আল হক জানান, এ বছর শীত মৌসুমে ভোলায় ৬৬ প্রজাতির সর্বমোট ৫০ হাজার ৪০টি পাখি গণনা করা হয়েছে।  এর মধ্যে মহাবিপন্ন পাখি চামুচঠুটো বাটানের সন্ধান মিলেছে ৩টি, বিপন্ন পাখি নর্ডম্যান সবুজপা ২টি, সঙ্কটাপন্ন পাখি দেশি গাঙচষা ১ হাজার ৬০টি, প্রায় বিপন্ন পাখি কালালেজ জৌরালি ৪ হাজার ৪২১টি, ইউরেশিয়ান গুলিন্দা ৪৩৭টি, বড় নট ৩শ ৫টি, নদীয়া পানচিল ৭টি, কালামাথা কাস্তেচড়া ৫শ ৪১টি, মরচেরং ভুতিহাস ৪টি।

তিনি আরও বলেন,‘বিশ্বের মহাবিপন্ন প্রজাতির পাখি চামচঠুঁট-বাটান এবং সংকটাপন্ন পাখি দেশি গাঙচষা, বড় নট ও বড়গুটি ঈগল ছাড়াও অনেক প্রজাতির হাস ও সৈকতপাখি শীতে ভোলার চরগুলিতে এসে বসবাস করে। এসব পাখির আহার অন্য পাখি থেকে ভিন্ন। তাই যে পাখির আহার যেখানে থাকে সেখানেই তারা আসে।’

তিনি বলেন, ‘যে প্রজাতির পাখিগুলো ভোলার চরাঞ্চলে আসে বুঝতে হবে এর আহার এখানেই আছে। পৃথিবীর আর কোথাও নেই। ফলে তাকে এখানেই আসতে হবে। এখানকার কাদা চরে ওই আহার না থাকলে সে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এমন পাখির মধ্যে চামুচঠুটো বাটান অন্যতম। এটি পৃথিবির মহাবিপন্ন একটি পাখি। মিয়ানমারের মার্টবান চর এবং ভোলার চর শাহাজালাল ও দমারচর ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও এর খাবার নেই। তাই শীত মৌসুমে এরা ৬ মাসের জন্য ভোলায় আসে।’

বাংলাদেশে পাখিদের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ন স্থানের মধ্যে ভোলা একটি। তাই বিশ্বের বহু বিপন্ন পাখির টিকে থাকার জন্য এই অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও জানান তিনি।

চামুচঠুটো বাটান পাখি সম্পর্কে বলতে গিয়ে জলপাখি গণনা দলে থাকা বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পর্যবেক্ষক অনু তারেক জানান, প্রতি বছরই পৃথিবীর মহাবিপন্ন পাখির মধ্যে চামুচঠুটো বাটানের দেখা মিলছে ভোলার চরাঞ্চলে। পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে মহাবিপন্ন এ পাখিটি যে কোনো সময় পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে পরে। তারা ধারণা করছেন, বর্তমানে পৃথিবীতে মাত্র ১শ জোড়া চামুচঠুটো বাটান পাখি অবশিষ্ট রয়েছে। এরা শীত মৌসুমে সাইবেরিয়া থেকে ছুটে আসে বাংলাদেশে। আবার প্রজননের জন্য জুলাই-আগস্ট মাসে এরা নিজ ভূমে ফিরে যায়। ভারতীয় উপমহাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার কোথাও গত একযুগে এই পাখিটির দেখা মিলেনি। স্বভাবত কারণেই চামুচঠুটো বাটান পাখি অন্য পাখির ঝাঁকের মধ্যে থাকে। ভিজা বালি ও কাঁদার উপরের স্তর থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে। ভোলার দমার চর ও চর শাহাজালালে এ পাখিটির বিচরণ রয়েছে।

বিশ্বের মহাবিপন্ন প্রজাতির পাখি চামচঠুঁট-বাটান একটি প্রজাতির দেখা মিলেছে ভোলায়

বিশ্বের মহাবিপন্ন প্রজাতির পাখি চামচঠুঁট-বাটান একটি প্রজাতির দেখা মিলেছে ভোলায়

বার্ডক্লাবের সদস্য বন্যপ্রাণী গবেষক ও বার্ড রিংগার সামিউল মোহসেনিন জানান, এক সময় ভোলার যে সব চরে জনবসতি ছিল না এখন সেখানে মানুষের গতাকম্য বেড়েছে। এর মধ্যে চরফ্যাসন উপজেলার ঢালচর, চর শাহজালাল, দমার চর, ডুবচর, চর পিয়াল, মাঝেরচর-১, মাঝেরচর-২, চর কুকুরী-মুকরী, কলাতলির চর, সোনার চর, চর মন্তাজ, টেগরার চর, কালকিনির চর ও ভেদুরিয়ার চর উল্ল্যেখযোগ্য। এগুলোর মধ্যে চর শাহাজালাল, দমার চর, চর পাতিলা, আন্ডারচর ও চর কুকরী মুকরীর পার্শবর্তী কাদা চরে পাখিদের বিচরণ অনেক বেশি। বিশেষ করে দমারচর ও চর শাহাজালালে এক সময় পাখিদের স্বর্গরাজ্য ছিল। আর এখন সেখানে গরু-মহিষ ও জেলেদের অবাধ বিচরণে পাখির প্রজোননক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে। ফলে পাখিরা এখন ওইসব চর তাদের জন্য নিরাপদ বলে মনে করছে না।
তাই এসব চরগুলো রক্ষায় সরকারের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

কথা হয় পাখিশুমারি দলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা পাখি-পর্যবেক্ষক ও পর্বত আরোহী এমএ মুহিতের সঙ্গে।

তিনি জানান, ২০০০ সাল থেকে তিনি প্রতি বছর এ পাখিশুমারি করে আসছেন। ভোলার চরগুলোতে ৪ ধরনের বিরল প্রজাতির পাখির দেখা মিলে। এগুলো হলো মহাবিপন্ন, বিপন্ন, প্রায় বিপন্ন ও সঙ্কটাপন্ন। বলা হয় যে দেশে যত বেশি পাখি আসে সে দেশের প্রকৃতি তত নির্ভেজাল। যেহেতু পৃথিবীর মহাবিপন্ন পাখিরা তাদের আসারস্থল হিসেবে ভোলার এসব চরাঞ্চলগুলো বেছে নিয়েছে। সেহেতু দেশের পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার জন্য সরকারের উচিৎ এসব স্থান সংরক্ষণ করা। বিশেষ করে এসব চরে মানুষ যেনো অবাধে বিচরণ করতে না পারে।

এ সময় তিনি বলেন, ‘আইন করে পাখিদের রক্ষা করা যাবে না। এজন্য মানুষকে সচেতন করতে হবে। অনেকে জানেও না যে পাখি মারা অপরাধ। তাই আমরা পাখি রক্ষায় বার্ডক্লাবের পক্ষ থেকে মানুষকে সচেতন করার কাজ করে যাচ্ছি।’

আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন পাখি পর্যবেক্ষক ইনাম আল হক জানান, নিছক সখ ও লালশার বশবর্তী হয়ে এক দল প্রভাবশালী শিকারি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে শীতকালে ভিড় জমায় ভোলার উপকূলের এসব চরাঞ্চলে। এছাড়া দিনের আলোতে প্রকাশ্যেই বনের গাছ লুট করছে দস্যুরা। যার ফলে পাখিরা এখন ওইসব চর তাদের জন্য  নিরাপদ বলে মনে করছে না।

এছাড়া, নদীগুলোতে জেলেরা কারেন্ট জাল দিয়ে অবাধে মাছ শিকার করছে। যে কারণে একদিকে যেমন পাখিদের খাদ্যোপযোগী মাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, জালে জড়িয়ে অনেক পাখিও প্রাণ হারাচ্ছে।

সবুজপাতা/ন্য/ডে/ভ

No comments

leave a comment