Homeসাক্ষাৎকার‘তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মা না বাঁচলে মরুকরণ ঠেকানো যাবে না’ -ড. শহিদুল ইসলাম

‘তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মা না বাঁচলে মরুকরণ ঠেকানো যাবে না’ -ড. শহিদুল ইসলাম

বিশ্ব মরুকরণ প্রতিরোধ দিবস আজ। সারা বিশ্বে দিনটিকে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। জাতিসংঘেরসাধারণ পরিষদে ১৯৯৪ সালের ঘোষণা অনুযায়ী, ১৯৯৫ সাল থেকে ১৭ জুন বিশ্বমরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস পালন করছে। বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি। মরুকরণের বিরুপ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে। অতিতে এর ফলে দুর্ভিক্ষ হয়েছে এদেশে। প্রতিনিয়ত পানির অভাবে পড়ছে এদেশের মানুষ। এ বিষয় নিয়ে সবুজপাতার সাথে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম। বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: মরুকরণ বিষয়টি একটু বুঝিয়ে বলবেন ?

ffffff

উত্তরাঞ্চলের নিত্য দিনের ছবি

উত্তর: আজকের দুনিয়ায় পরিবেশের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে মরুকরণ অন্যতম। জাতিসংঘবলছে, পৃথিবীর প্রায় দেড়শ’ কোটি মানুষ বেঁচে থাকার জন্য ক্ষয়িষ্ণু ভূমিরওপর নির্ভরশীল। আর পৃথিবীর অতিদরিদ্রদের ৪২ ভাগই বাস করে ক্ষয়ে যাওয়াএলাকায়, যারা মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করছে। এই ভূমিক্ষয় জলবায়ুপরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করছে, যা শুধু আমাদের বেঁচে থাকার জন্যই বিপদেরকারণ নয়, বরং এটি আমাদের শান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। আর আমাদের দেশে মরুকরণ শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকে। অতীতে দুর্ভিক্ষ হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ এর প্রভাবে মারা গেছে। যেহেতু মরুকরণের প্রভাব আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রত্যক্ষ নয়, সেহেতু আমরা এটিকে সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি না। দেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ মরুকরণের বিরূপ প্রভাবে নানা ভাবে মূল্য দিচ্ছে।

 

প্রশ্ন: আমাদের উদ্বেগ হওয়ার প্রধান প্রধান কারণ কী তাহলে?

উত্তর: আমাদের উদ্বেগের কারণ হলো, প্রতিবেশি দেশ ভারত তিনটি বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত করতে সেদেশের সরকার সচেষ্ট। প্রকল্পগুলো হচ্ছে, জিকে প্রকল্প, বরেন্দ্র প্রকল্প ও তিস্তা বাঁধ। এগুলোর ফলে, পদ্মা ও তিস্তার পানি আমরা প্রয়োজনমত ব্যবহার করতে পারছি না। সৃষ্টি হচ্ছে কৃত্রিম সঙ্কট। ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দিন দিন আমাদের ফসলি জমি কমেপরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে কমছে গাছপালা, বন-জঙ্গল। তার চেয়েবড় বিষয়, আমাদের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য জলাধারের অবস্থাওসঙ্গিন। দিন দিন যেমন আমাদের ফসলি জমি কমছে, একই সঙ্গে খরায় উর্বরতাহারাচ্ছে জমি। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনেঝুঁকিপূর্ণ তিনটি দেশের একটি বাংলাদেশ। এ অবস্থায় পরিবেশের প্রতি আমাদেরমনোযোগী হওয়া আবশ্যক। জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজনে ভূমি এবংমাটির প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধির কথা যেমন বলছে, তেমনি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিব্যবস্থাপনার প্রতি দৃষ্টি দেওয়ারও তাগিদ করছে। একই সঙ্গে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা বিধানে ভূমি এবং মাটির ওপরও গুরুত্ব আরোপের বিষয়টি এনেছে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ কেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

uikhfsc

পুকুরের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় সৃৃষ্টি হচ্ছে পানির সঙ্কট

উত্তর: আমি মোটা দাগে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রধানত বৈশ্বিক কারণ। দ্বিতীয়ত প্রতিবেশি দেশ ভারতের বিরূপ আচরণ। এবং সবশেষ আমাদের দেশে পানির অব্যবস্থাপনা। প্রথম কারণটি বলতে গেলে, এর জন্য কোনভাবেই আমাদের মত দেশগুলো দায়ী নয়। তারপরও সবেচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমুদ্রতীরবর্তী দেশগুলো। উন্নত দেশগুলোতে বেশি বেশি শিল্পায়ন হচ্ছে। পরিবেশে তারা বেশি বেশি কার্বণ নির্গমন করছে। কিন্তু সেই তুলনায় তাদের পরিবেশ রক্ষায় বা এর জন্য বিকল্প কার্যক্রম পরিচালনা করার কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

 

 

প্রশ্ন: পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন কনভেনশনে উন্নত দেশগুলো এক প্রকার ডোনেশন দিয়ে থাকে ?

উত্তর: হ্যা, তারা জাতিসংঘ ও পরিবেশবাদীদের চাপের কারণে এক প্রকার ডোনেশন দিচ্ছে। তবে, প্রকৃতি ও জীব বৈচিত্রকে যেভাবে অতি সুক্ষভাবে ক্ষতি করে চলেছে সেই তুলনায় তা সামান্য। আর ডোনেশন দিয়ে প্রকৃতির যে ক্ষতি করা হয় তা কাটানো সম্ভব নয়।

প্রশ্ন: যা বলছিলেন, দ্বিতীয়ত ?

উত্তর: আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারত আমাদের দেশে যে সব নদীগুলো প্রবেশ করেছে বিশেষ করে বড় বড় নদী। এগুলোতে বাঁধ নির্মাণ করে নদীর পানি তুলে নিচ্ছে। নদীর পানির ন্যায্য অধিকার থেকে তারা আমাদের বঞ্চিত করছে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও পদ্মার পানি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা। ফলে আমাদের দেশে মরুকরণ হচ্ছে। আমাদের ইকো সিস্টেমে পরিবর্তন আসছে। পানির ঘাটতি পূরনে অন্য কোন পথ বাংলাদেশের হাতে নেই। তৃতীয়ত, পানির ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে। আমাদের দেশে এখনও পানির জন্য লাইনে মানুষকে দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার পরও পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না। পানির ভূগর্ভে পানির লেয়ার অনেক নিচে নেমে গেছে। উপরিভাগের পানি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। দুষিত করে ফেলিছি নদীর পানি।

প্রশ্ন: এসবের ফলে আমাদের উপর কি ধরণের প্রভার পড়ছে ?

dgdgsdg

ঢাকার পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা হয় না

উত্তর: মরুকরণের ফলে সবেচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের কৃষি। জমিতে ঠিকমত পানি দিতে পারছি না। ক্লাইমেট চেঞ্জের কারণে অসময়ে বৃষ্টি হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চাষাবাদ। পানির অভাবে জীববৈচিত্র ধ্বংসের কবলে পড়েছে। পানি ছাড়া যেমন কোন কিছুই কল্পনা করা যায় না। ঠিক তেমনি ভাবে পানির অপব্যবহারও আমরা রোধ করতে পারছি না। পানি সঙ্কটের কারণে উৎপাদনশীলতা হারাচ্ছে মাটি। এর ফলে আমাদের খাদ্যের সঙ্কট সৃষ্টি হবে। খাদ্য সঙ্কট সৃষ্টির সাথে দরিদ্রতার একটা সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ আরও বেশি দরিদ্র হচ্ছে।

 

 

প্রশ্ন: অনেক সঙ্কটের কথা শুনলাম, সমাধানের পথ?

উত্তর: সারা বিশ্বে পরিবেশবাদীরা এখন অনেক সক্রিয়। যেটি সম্প্রতি বাংলাদেশেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সবাইকে এক হয়ে সমস্যার কথা তুলে ধরতে হবে। বিশ্বের নানা প্রান্তে যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করছে এবং পরিবেশ ধ্বংস করছে তাদের সাথে লিংক তৈরি করা যেতে পারে। নিজেদের জন্য নিজেরা উদ্যোগি হতে হবে। আমাদের প্রতিবেশি দেশের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা জরুরী। তারা সহযোগীতা না করলে আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে। ভারত স্বাভাবিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আমাদের অধিকার ফিরিয়ে না দিলে তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে। যেভাবে অধিকার আদায় করা যায় সেটা করা প্রয়োজন। দেশের মধ্যে পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বৃষ্টির পানি ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ানো উচিত। এগুলো আমাদের সঙ্কট কাটাতে কিছুটা ভূমিকা রাখবে।

প্রশ্ন: স্যার আপনাকে ধন্যবাদ।

উত্তর: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার: আনিস রহমান, পরিবেশ ও গণমাধ্যম কর্মী

সম্পাদনা: নাতাশা ত্রিপুরা

 

Post Tags
No comments

Sorry, the comment form is closed at this time.