Homeসাক্ষাৎকার“ঢাকাকে সবুজায়ন করতে প্রথমেই বাড়াতে হবে গাছপালার সংখ্যা”

“ঢাকাকে সবুজায়ন করতে প্রথমেই বাড়াতে হবে গাছপালার সংখ্যা”

আমেরিকান ফরেস্ট রিচার্স ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যানমতে, দুই একর জায়গায় বড় গাছসমৃদ্ধ একটি বনভূমি গোটা পঁচিশ মানুষের পর্যাপ্ত অক্সিজেনের জোগান দেয়। সে হিসাবে ঢাকার দেড় কোটি মানুষের জন্য যে পরিমাণ গাছ প্রয়োজন তার খুব কমই রয়েছে এখানে। কিন্তু রাজধানীর ঘনবসতির কারণে এখানে বৃক্ষায়ণের সুযোগ কম।-স্থপতি রফিক আজম

ঢাকা: রাজধানী ঢাকা ষড়্ঋতুর শহর হতে পারত। যদি নানা রকম দেশীয় গাছ থাকত, তবে এগুলোর ফুল ও ফল দেখে আমরা সহজেই বুঝতাম কখন কোন ঋতু। গাছগুলো আমাদের রোদে ছায়া দিত, বৃষ্টি নামাত আর বাতাসের প্রবাহকে বাড়িয়ে অস্বাভাবিক তাপমাত্রাকে রাখত নিয়ন্ত্রণে। ফলে অতিরিক্ত গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠত না; নগরবাসী পেত স্বস্তি। বাড়ত পাখি, প্রজাপতি ও অন্যান্য প্রাণীবৈচিত্র্যের সংখ্যা।

রাস্তা ও শহরের সৌন্দর্য বাড়ত অনেকাংশে। কিন্তু আদৌ তা হয়নি। এখন। এ জন্য নগরের পানি ধরে রাখতে হবে, যাতে মাটি থাকে ভেজা। নদী, পুকুর, খাল, জলাধার ইত্যাদিতে পানি সংরক্ষণ করতে হবে। ভূতলের পানির স্তর বাড়াতে খালি জায়গা রাখতে হবে, যেন বৃষ্টির পানি প্রবেশ করতে পারে। এসবের মাধ্যমেই গাছপালা বেড়ে ওঠার একটি উৎকৃষ্ট পরিবেশ নিশ্চিত হবে। যেহেতু এখন বর্ষাকাল, এটাই গাছ লাগানোর উপযুক্ত সময়।

City-Pond-by-Syed-Zakir-Hossainসবুজ নগরায়ণ বলতে নগরকে গাছে ঢেকে ফেলা বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। শহরের সবকিছুই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। যতই গাছ লাগাই, তাতে সমস্যার সমাধান হবে না। রাজধানীর আয়তনের ওপর ভিত্তি করে জনসংখ্যার অনুপাত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বের করতে হবে, কোন বিষয়গুলো সমস্যা সৃষ্টি করছে? কেন মানুষ শহরে আসছে? শহরে ধারণক্ষমতার মধ্যে লোকবল সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।

অতিরিক্ত মানুষকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ঢাকা থেকে অন্যত্র স্থানান্তর করতে হবে। সড়কের ওপর চাপ কমাতে নদী ও রেলপথের ব্যবহার বাড়াতে হবে। গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তা না হলে নগরের প্রতিবেশব্যবস্থা ফেরানো যাবে না। যারা নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সেগুলোকে প্রয়োজনে ভাঙতে হবে। এ জন্য সরকারকে কঠোর হতে হবে।

রাজধানীর খালি জায়গায় গাছ লাগানো যেতে পারে। আমেরিকান ফরেস্ট রিচার্স ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যানমতে, দুই একর জায়গায় বড় গাছসমৃদ্ধ একটি বনভূমি গোটা পঁচিশ মানুষের পর্যাপ্ত অক্সিজেনের জোগান দেয়। সে হিসাবে ঢাকার দেড় কোটি মানুষের জন্য যে পরিমাণ গাছ প্রয়োজন তার খুব কমই রয়েছে এখানে। কিন্তু রাজধানীর ঘনবসতির কারণে এখানে বৃক্ষায়ণের সুযোগ কম। এ জন্য ঢাকার চারপাশের পেরিফেরি বা সীমান্ত এলাকায় (আশুলিয়া, গাজীপুর, সাভার ইত্যাদি) গাছ লাগাতে হবে। এসব এলাকা দিনে দিনে দখল হয়ে যাচ্ছে।

দখলবাজদের কবল থেকে বাঁচাতে ব্যাপক বনায়ন করা যেতে পারে। বিভিন্ন জোন-ভিত্তিক ফলের বাগান করা যেতে পাDhaka Treeরে। এসব দেখভালের দায়িত্বে থাকবে স্থানীয় জনগণ। অনেকটা সামাজিক বনায়নের মতো। তাহলে ওই সব এলাকার বনভূমি থেকে পাবে রাজধানীবাসী অক্সিজেন। এ ছাড়া প্রতিটি বাড়িতে অন্যান্য গাছের সঙ্গে অন্তত একটি বড় গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক করা উচিত। প্রতিটি বাড়ির ছাদেও বাগান করার ব্যাপারে চালানো যেতে পারে জোর প্রচারণা। এ ছাড়া সড়কদ্বীপ, রাস্তার দু-ধার, খালি জায়গাসহ বিভিন্ন জায়গায় গাছ লাগানো যেতে পারে।

একসময় আমাদের সুসভ্য নগর ছিল! সেই নগরকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরো, সিঙ্গাপুর, ভারতের কলকাতাসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশ বৃক্ষায়ণ ও অন্যভাবে তাদের শহরের অনেক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এখন রাজধানী ঢাকাকে সবুজায়ন করতে পুরো শহরকেই সবুজ ল্যান্ডস্কেপে পরিণত করতে হবে। সবাইকেই সৌন্দর্যবর্ধনে এগিয়ে আসতে হবে। স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী সবাইকে কাজ করতে হবে এক হয়ে। এ জন্য প্রয়োজন কিছু মানুষের জাগরণ, চাই আলোকিত সব মানুষ। এ জন্য হয়তো সময় লাগবে। তবে থেমে থাকলে কিন্তু চলবে না।

স্থপতি রফিক আজম, প্রিন্সিপ্যাল আর্কিটেক্ট, সাতত্য

সাক্ষাৎকার গ্রহন: মাহফুজ ফারুক। পরিবেশ ও স্থাপত্য বিষয়ক সাংবাদিক

No comments

Sorry, the comment form is closed at this time.