Homeসবুজ জীবনছুটির গন্তব্য যদি হয় বান্দরবান – শেষ পর্ব

ছুটির গন্তব্য যদি হয় বান্দরবান – শেষ পর্ব

ঢাকা,১৮ অক্টোবরঃ বান্দরবান শহরের  আশেপাশের সৌন্দর্যই মুগ্ধ করে তুলবে আপনাকে। কিন্তু  বান্দরবানের মূল আকর্ষণ গুলোই যে রয়েছে শহরের বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এসব জায়গা না দেখলে বাংলার আসল  সৌন্দর্যের অনেকটাই অদেখা থেকে যাবে। কিন্তু এসব জায়গা ভ্রমন করতে হলে আপনাকে অবশ্যই হতে হবে এডভাঞ্চারাস। বেয়ে উঠতে হবে পাহাড়ের পর পাহাড়। ঝুকিপূর্ণ  এসব স্পট গুলো ভ্রমনে অবশ্যই স্থানীয় একজন গাইডকে সাথে নিন । মন জুড়ানো আরও কিছু জায়গায় ভ্রমন নির্বিগ্ন করতে  আজ পাঠকদের জন্য থাকছে আরও কিছু জায়গায় ভ্রমণের আদ্যোপান্ত। 

বগালেক:

সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট বগালেক। কেওকারাডাং এর কোল ঘেঁষে বান্দারবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে এবং রুমা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। পাহাড়ের উপরে প্রায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে এই লেকের অবস্থান। এ পানি দেখতে প্রায় নীল রঙের। এ লেকের পাশে বাস করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র উপজাতীয় বম ও খুমী সম্প্রদায়।  অদ্ভুদ সুন্দর এই নীল রঙ্গের লেকের সঠিক গভীরতা বের করা যায়নি। স্থানীয়ভাবে দুইশ’ থেকে আড়াইশ’ ফুট বলা হলেও সোনার মেশিনে ১৫১ ফুট পর্যন্ত গভীরতা পাওয়া গেছে। এটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ একটি লেক। এর আশেপাশে পানির কোন উৎসও নেই। তবে বগালেক যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে ১৫৩ মিটার নিচে একটি ছোট ঝর্ণার উৎস আছে যা বগাছড়া (জ্বালা-মুখ) নামে পরিচিত। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে লেকের পানি প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মে মাসে ঘোলাটে হয়ে যায়।

Boga Lake

রাত্রি যাপনের জন্য বগালেকে জেলা পরিষদের অর্থায়নে একটি রেষ্টহাউস নির্মান করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় বম উপজাতী সম্প্রসাদায় কিছু ঘর ভাড়ায় দিয়ে থাকে । বগালেকের পাড়েই বসবাসরত বম সম্প্রদায় পর্যটকদের জন্য রান্না-বান্নার ব্যবস্থা করে থাকে ।  রুমা বাজার থেকে প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার ক্রয় করে নেওয়াই শ্রেয়। উল্লেখ্য যে, নিরাপত্তার জন্য রুমা ও বগালেক সেনা ক্যাম্পে পর্যটকদের রিপোর্টে করতে হয়। স্থানীয় গাইড ছাড়া পায়ে হেটে রুমা থেকে অন্য কোন পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়া উচিত নয়।

যাতায়তঃ শুষ্ক মৌসুমে বান্দরবান জেলা সদরের রুমা জীপ ষ্টেশন থেকে রুমাগামী জীপে করে রুমা সেনা গ্যারিসন (রুমা ব্রীজ) পর্যন্ত যাওয়া যায়। সেখান থেকে নৌকায় করে ২০ মিনিট পথ পাড়ি দিয়ে রুমা উপজেলা সদরে যেতে হয়। বর্ষাকালে রুমাগামী জীপ কইক্ষ্যংঝিড়ি পর্যন্ত যায় । তারপর ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে প্রায় ১ ঘন্টার অধিক পথ পাড়ি দিয়ে রুমা সদরে যেতে হয় । রুমা থেকে পায়ে হেটে অথবা জীপে করে বগালেক যেতে হয় । বর্ষা মৌসুমে বগা লেক যাওয়া নিতান্তই কষ্টসাধ্য তাই বগালেক ভ্রমনে শীতকালকে বেছে নেওয়া শ্রেয়ে। বান্দরাবন থেকে রুমা উপজেলা সদরে যেতে খরচ হবে জন প্রতি ৮০/- অথবা পুরো জীপ ভাড়া করলে ২২০০-২৫০০/- আর রুমা থেকে বগালেক যেতে জনপ্রতি ৮০-১০০/- অথবা পুরো জীপ ভাড়া করলে ২২০০-২৫০০/- পর্যন্ত ।

 কেওক্রাডং এবং  তাজিংডংঃ

বেসরকারি হিসাবে পর্বত শৃঙ্গ তাজিংডং বাংলাদেশের চতুর্থ। উচ্চতা ১২৮০ মিটার।  কেওক্রাডং বাংলাদেশের ৩য় সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ। উচ্চতা ১২৯০ ফুট।  স্থানীয় উপজাতীয়দের ভাষায় ‘তাজিং’ শব্দের অর্থ বড় আর ‘ডং’ শব্দের অর্থ পাহাড় যা একত্রিত করলে হয় তাজিংডং। এটি বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার রেমাক্রী পাংশা ইউনিয়নে অবস্থিত। রুমা উপজেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পর্বতের অবস্থান। বর্ষা মৌসুমে তাজিংডং যাতায়ত অত্যান্ত কষ্টকর। শুষ্ক মৌসুমে অনেক পর্যটককে এডভেঞ্চার হিসাবে পায়ে হেটে তাজিংডং যেতে দেখা যায়। বর্তমানে রুমা উপজেলা সদর থেকে চাঁদের গাড়ীতে করে কেওক্রাডং এর কাছাকাছি যাওয়া যায়।

Keokardong

যাত্রার জন্য বগালেক থেকে খুব ভোরে যাত্রা করতে হবে সেক্ষেত্রে আসা যাওয়াসহ ৮-১০ ঘন্টা হাটার অভ্যাস থাকতে হবে। তাজিংডং ভ্রমনকারীদের অবশ্যই ভ্রমনের সময় শুকনো খাবার, খাবার পানি, জরুরী ঔষুধপত্র সঙ্গে নিতে হবে। যাত্রাপথ দূর্গম ও কষ্টসাধ্য বিধায় মহিলা ও শিশুদের নিয়ে এ পথে যাত্রা করা উচিত নয়। রুমা উপজেলা সদরে রাত্রিযাপনের জন্য কয়েকটি হোটেল থাকায় দলবেধেঁ যাত্রা করার আগে হোটেল বুকিং করা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে নিন।

পর্যটকদের তাজিংডং যেতে হলে বান্দরবান জেলা সদর থেকে প্রথম যেতে হবে রুমা উপজেলা সদরে। রুমা উপজেলা যাত্রা পথে রুমা সেনা গ্যারিসনে পর্যটকদের নাম ও ঠিকানা লিপিবদ্ধ করতে হবে। পরবর্তীতে রুমা উপজেলা সদর সেনা ক্যাম্পে আবার ও রির্পোট করতে হবে।

রুমা উপজেলা সদর থেক সাধারণত বিকাল ৪ টার পরে বগালেক, কেওক্রাডং বা তাজিংডং এর উদ্দেশে যেতে দেয়া হয় না। যাত্রা যদি হয় বর্ষা মৌসুমে তাহলে বান্দরবান শহরের রুমা জীপ ষ্টেশন থেকে রুমাগামী চাঁদের গাড়ীতে করে কৈক্ষ্যং ঝিড়ি যেতে হবে। তারপর নৌকায় ১ ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে রুমা সদর। যদি শীতের মৌসুম হয় তাহলে জীপে করে রুমা উপজেলা সদরের কাছে বোটঘাটায় পৌছে দেবে গাড়ী, সেখান থেকে নৌকায় করে ১৫-২০ মিনিটের নৌকা ভ্রমন শেষ আপনি রুমা উপজেলা সদরে পৌছাতে পারবেন। রুমা উপজেলা সদর থেকে পায়ে হেটে বগালেক হয়ে কেওক্রাডং এর পাশ দিয়ে তাজিংডং যেতে হয়।

থাকা ও খাওয়ার ব্যাবস্থা হবে বগা লেক, দার্জেলিং পাড়াতে । রুমা বাজার থেকে বগালেক/ কেওকারাডাং/ তাজিংডং/ জাদিপাই যেতে হলে গাইড অবশ্যই নিতে হবে ।  কেওকারাডাং পর্যন্ত গাইড প্রতিদিন ৫০০টাকা, তাজিংডং/ জাদিপাই গেলে ২৫০০ টাকা নিতে পারে। এজন্য কথা বলে নেয়া ভালো। একজন ভাল গাইডের নাম্বার দেয়া হল।  ও ব্যস্ত থাকলে অন্য গাইডের ব্যবস্থা করে দিতে গাইডঃ নিউটন – ০১৮৪৫৭৭৯৭৪৯

জাদিপাই জলপ্রপাত:

কেউক্রাডাং থেকে পায়ে হেঁটে ১ ঘন্টায় জাদিপাই জলপ্রপাতে পৌছানো যায়। কেউক্রাডং থেকে নিচে নামতে হয় যাওয়ার সময়। ফিরে আসার সময় উপড়ে উঠতে হয় বিধায় সময় ২ ঘন্টা মত লাগে। তবে নিচে নামাটাই বিপদজনক। শেষের কিছু অংশ বেশ পিচ্ছিল। দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আছে। যাওয়ার সময় জোকের কামড় অবধারিত। সাথে অবশ্যই গাইড নিতে হবে।

Jadipai Falls

যাতায়াতঃ বাস ভাড়া- চট্টগ্রাম হতে বান্দরবন ১০০ টাকা; বান্দরবন হতে কাইখ্যংছড়ি ১০০ টাকা। নৌকা ভাড়াঃ কাইখ্যংছড়ি হতে রুমাবাজার ৩০-৪০ টাকা।

ঋজুক জলপ্রপাতঃ

প্রাকৃতিক পাহাড়ী পানির অবিরাম এ ধারাটি জেলা সদর হতে ৬৬ কিঃমিঃ দক্ষিণ-পূর্বে রুমা উপজেলায় অবস্থিত। নদী পথে রুমা হতে থানচি যাওয়ার পতে সাঙ্গু নদীর পাড়ে ৩০০ ফুট উচু থেকে সারা বছরই এ জলপ্রপাতটির রিমঝিম শব্দে পানি পড়ে। রুমা হতে ইঞ্জিনচালিত দেশী নৌকায় সহজেই এ স্থানে যাওয়া যায়। মার্মা ভাষায় একে রী স্বং স্বং বলা হয়। রুমা বাজার থেকে নৌকা ভাড়া করে যাওয়া যায়। নৌকা ভাড়া ৫০০-৫৫০ টাকা.

???????????????????????????????

নাফাখুম জলপ্রপাত (বাংলাদেশের নায়াগ্রা)

বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার রেমাক্রি স্থানটি সাঙ্গু নদীর উজানে একটি মারমা বসতী। মারমা ভাষায় ‘খুম’ মানে হচ্ছে জলপ্রপাত। রেমাক্রি থেকে তিন ঘন্টার হাঁটা পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় আশ্চর্য সুন্দর সেই জলপ্রপাতে, যার নাম ‘নাফাখুম’। রেমাক্রি খালের পানি প্রবাহ এই নাফাখুমে এসে বাঁক খেয়ে হঠাৎ করেই নেমে গেছে প্রায় ২৫-৩০ ফুট। প্রকৃতির খেয়ালে সৃষ্টি হয়েছে চমৎকার এক জলপ্রপাত! সূর্যের আলোয় যেখানে নিত্য খেলা করে বর্ণিল রংধনু! ভরা বর্ষায় রেমাক্রি খালের জলপ্রবাহ নিতান্ত কম নয়। প্রায় যেন উজানের সাঙ্গু নদীর মতই। পানি প্রবাহের ভলিউমের দিক থেকে সম্ভবতঃ নাফাখুম-ই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত।

Nafakhum

যাতায়াতঃ

বান্দরবান শহর থেকে থানচি উপজেলা সদরের দূরত্ব ৮২ কিঃমিঃ। রিজার্ভ চাঁদের গাড়ীতে বান্দরবান থেকে থানচি যেতে সময় লাগবে ৩ ঘন্টা, ভাড়া নেবে ৪  হাজার টাকা। থানচি থেকে রেমাক্রি নৌকায় যাওয়া-আসা, ভাড়া চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। বর্ষায় ইঞ্জিনবোটে থানচি থেকে তিন্দু যেতে সময় লাগবে আড়াই ঘন্টা। তিন্দু থেকে রেমাক্রি যেতে লাগবে আরও আড়াই ঘন্টা। এই পাঁচ ঘন্টার নৌ-পথে আপনি উজান ঠেলে উপরের দিকে উঠতে থাকবেন। শীতের সময় ইঞ্জিন বোট চলার মত নদীতে যথেষ্ট গভীরতা থাকেনা। তখন ঠ্যালা নৌকাই একমাত্র বাহন। বর্ষা মৌসুমে তিন দিনের জন্য ইঞ্জিনবোটের ভাড়া পড়বে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। আর শীত মৌসুমে ঠ্যালা-নৌকার ভাড়া পড়বে প্রতি দিনের জন্য ১০০০ টাকা।

থাকাঃ থাকার জন্য যেতে হবে তিন্দু, রেমাক্রি। মারমাদের বাঁশ-কাঠের বাড়ীতে অনায়াসে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে আপনাদের। মারমাদের প্রায় প্রতিটি বাড়ীতেই খুব অল্প টাকায় এমন থাকা-খাওয়ার সুবিধে রয়েছে। তিনবেলা খাওয়ার খরচ পরবে জনপ্রতি ২০০ টাকা, আর থাকা ফ্রি। তবে যে বাড়ীতে ফ্রি থাকবেন। খেতে হবে তাঁর দাওয়ায় বসেই।

দেশের ভেতর এরকম একটি নির্মল, নির্জন নিসর্গে একবার হলেও সবার ঘুরে আসা উচিত। হাতে মাত্র ৩-৫ দিন সময় নিয়ে অনায়াসেই ঘুরে আসা যেতে পারে নীলগিরিসহ  বান্দরবান-এর প্রধান কয়েকটি পর্যটন স্পট। ভ্রমণের মাধ্যমেই জানা যায় পৃথিবীকে। নিরাপদে ভ্রমন করুন আর উপভোগ করুন পৃথিবীর সৌন্দর্য । ভ্রমণের মাধ্যমেই জেগে উঠে প্রকৃতি প্রেম আর তাই বেঁচে থাকার তাগিদেই নিজের মধ্যে জাগিয়ে তুলুন সবুজ তথা প্রকৃতি প্রেম। আর ভ্রমণের মাধ্যমে নতুন উদ্যমে হয়ে উঠুন কর্মচঞ্চল .

 তারিকুল হাসান আশিক, সংবাদ কর্মী

[email protected]

No comments

Sorry, the comment form is closed at this time.