Homeগ্রিন আইকন‘গাছগুলোর বদলে যেন জান্নাত পাই’

‘গাছগুলোর বদলে যেন জান্নাত পাই’

সত্তরোর্ধ্ব  এক বুড়োকে রংপুরের মিঠাপুকুরের সবাই চেনেন, বিখ্যাত আম হাড়িভাঙ্গার সম্প্রসারক হিসেবে। ২ একর জমি দিয়ে শুরু করা তার বাগানের আয়তন আজ ৮ একরেরও বেশি। আর তার –ঐ যে আম রাজত্বের, পুরোটা জুড়েই হাড়িভাঙ্গা আম গাছের-ই রাজত্ব।  হাড়ি ভাঙা আম তো মিঠা পুকুরে নয়, তার নিরলস পরিশ্রমের কারনে ঐ সুমিষ্ট আমের প্রজাতির বিস্তার ঘটেছে উত্তরের প্রায় সব জেলা সহ বাংলাদেশের অনেক জায়গায়।  ঢাকার আম বাজারেও হটকেক হিসেবে হাড়িভাঙ্গা এখন বেশ সমাদৃত।  একটি মাত্র মা-গাছ থেকে হাজার হাজার কলম তৈরী করে হাড়িভাঙ্গার বিজ ছড়িয়ে দিতেই কাজ করছেন সালাম সরকার। তার নিজের আত্ববিস্বাসের স্লোগান, বিশ্বসেরা আম-হাড়িভাঙ্গা তার নাম। রংপুর ঘুরে এসে লিখেছেন তারিকুল হাসান আশিক।

রংপুর, ৪ সেপ্টম্বর: রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার আখিরাহাটের বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুস সালাম সরকার। বাড়ীর আশে পাশের ৮ একর  বা ২৪ বিঘার বেশি জায়গা জুড়ে তার আম-রাজত্ব। বাগানে পায়চারি করেন সফেদ পান্জাবি-পাজামা পরে। পরম মমতায় গাছ গুলিকে বড় করার ব্যবস্থা করে চলেছেন। বাসার দেয়াল জুড়ে স্থানীয় সংসদ এন এইচ আশিকুর রহমান সহ নানান গুনী মানুষের ছবি,যারা তার এই বাগান দর্শনে এসেছেন মুগ্ধ হয়েছেন।

সত্তরোর্ধ্ব  এর বুড়োকে রংপুরের মিঠাপুকুরের সবাই চেনেন, বিখ্যাত আম হাড়িভাঙ্গার সম্প্রসারক হিসেবে। আর তার –ঐ যে আম রাজস্ত, সেখানে পুরো বাগান জুড়েই হাড়িভাঙ্গা আম গাছের-ই রাজত্ব। ২ একর জমি দিয়ে শুরু করা সেই আম বাগানের আয়তন আজ ৮ একরেরও বেশি।পেয়েছেন সাফল্য । তাকে অনুকরণ করে রংপুরের শত শত মানুষ এই হাড়িভাঙ্গা আম চাষে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। যার ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে সাড়া দেশে।

10647540_10152496812994597_1804887443_oআবদুস সালাম সরকার এই গাছের কলম সংগ্রহ করে নিজের বাগান করেন। ছড়িয়ে দেন উত্তরাঞ্চলসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তত দিনে যমুনেশ্বরী গ্রাস করেছে আম বাগান। যা-ও কিছু ছিল তাও কেটে নিয়েছেন স্থানীয়রা। তিনি ফিরে আসেন মাতৃ গাছের কাছে, এবং সবাইকে বলে প্রচার শুরু করেন এই গাছের আমের নাম হাঁড়িভাঙা আম।

এই হাড়ি ভাঙা আম তো মিঠা পুকুরে নয়, তার নিরলস পরিশ্রমের কারনে ঐ সুমিষ্ট আমের প্রজাতির বিস্তার ঘটেছে উত্তরান্চলের প্রায় সব জেলা সহ বাংলাদেশের অনেক জায়গায়।  ঢাকার আম বাজারেও হটকেক হিসেবে হাড়িভাঙ্গা এখন বেশ সমাদৃত। কিন্তু এই আমটি একটি মাত্র মা-গাছ থেকে হাজার হাজার কলম তৈরী করে হাড়িভাঙ্গার বিজ ছড়িয়ে দিতেই কাজ করছেন সালাম সরকার। তার নিজের আত্ববিস্বাসের স্লোগান, বিশ্বসেরা আম-হাড়িভাঙ্গা তার নাম।

দয়ার দান নামক এক নার্সারীকে সামনে রেখে পরিচালিত হচ্ছে তা এই আমের রাজত্ব। এটিকে অর্থকারী ফসল হিসেবে উত্তরান্চলে প্রতিষ্টিত করা যায় কিনা, সেটি-ই তার বড় আন্দোলন এখন।

হাড়িভাঙ্গা আম কিভাবে অর্থকারী ফসল এমন প্রশ্নের জবাবে সালাম সরকার জানান, অন্যান্য আমের চাইতে এ আমাদের উৎপাদন বেশি অর্থাৎ  অন্যান্য আমের তুলনায় মুকুল থেকে ঝরে কম আর স্বাদে গুনে অনন্য হওয়ায় এর চাহিদা এবং দাম দুটাই বেশি ।

গাছের প্রতি ভালোবাসা সেই ছোটবেলা থেকাই। স্বপ্ন ছিল বাগান করার । কর্মজীবনে ছিলেন সরকারের সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তা।১৯৮৪ সালের দিকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েই নেমে পরেন সেই স্বপ্ন পূরণের কাজে । যাত্রা শুরু হল ‘দয়ার দান’ বাগান ও নার্সারির। শুরু করলেন উন্নত জাতের বিভিন্ন ফলের বীজ সংগ্রহের কাজ ।

বছর খানেক তালাশ করলেন ভালো আমের। ঘুরলেন উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। সব আমিই প্রায় এক। কোনটা বেশি মিষ্টি। কোনটা বেশি টক। কোনটা দুইয়ের মাঝামাঝি। যে আমের খোঁজে অনেক পথ হাঁটলেন সেই আম যে তারই বাড়ির কাছেই রয়েছে তা কে জানতেন।

Rangpur Doyar Danস্থানীয় বাজার থেকে তিনি কিছু আম আনলেন। প্রায় ৩৫০ গ্রাম ওজনের একটি আমকে তার কাছে অন্য রকম মনে হলো। খেয়ে দেখলেন সত্যি এ আম আমাদের দেশের আমের চেয়ে ভিন্ন স্বাদের। খুঁজতে লাগলেন আমের মালিককে। জানতে পারলেন এটি ১ নম্বর খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানি গ্রামের মৃত তমির উদ্দিন পাইকারের বাগানের আম। তমির উদ্দিন ও তার ছেলে মৃত নফল উদ্দিন পাইকার জীবিতকালে নিজেদের এবং জমিদার তাজ বাহাদুরের বালুয়া মাসুমপুরের বাগান বাড়ির আম বিক্রি করতেন।

জমিদাররা তত দিনে চলে গেছেন ভারতে। বিশাল বাগানবাড়ি স্থাপনা পড়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। প্রতি বছর যমুনেশ্বরী নদী প্রবল দাফটে ভাঙছে পুরাকীর্তি, ফসলের মাঠ। আমবাগানসহ সব যেন বেওয়ারিশ সম্পদ। লোকমুখে শোনা যায়, জমি বরেন্দ্র প্রকৃতির হওয়ায় তৎকালীন শুকনো মৌসুমে গাছের গোঁড়ায় পানি দেয়ার সুবিধার্থে একটি হাড়ি বসিয়ে ফিল্টার পদ্ধতিতে পানি সেচের ব্যবস্থা করা হতো । অল্পদিনের মধ্যে কে বা কারা একটি গাছের হাড়ি ভেঙ্গে ফেলেন। কালের বিবর্তনে বৃক্ষটি ফলবান হয় । মৃত নফল উদ্দিনের পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব আর ভোক্তাবৃন্দ আমটি খাওয়ার পর তাকে জিজ্ঞেস করেন যে, এতো সুমিষ্ট, সুস্বাদু আমটি কোথায় পেলেন ? তদুত্তরে নফল উদ্দিন জানান যে, “ যে গাছের হাড়িটি ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল এটা সে গাছের আম।”

শুধু আমই নয় , বহুচাষ পদ্ধতি অবলম্বন করে আমবাগানেই গড়ে তুলেছেন লটকন, বাতাবি লেবু, ওলকচু সহ নানা ফলফলাদির ব্যাপক সম্ভার যা নজর করার মতো । দেশকে সবুজ করে তোলার প্রবল ইচ্ছায় বিনা মূল্যে বিলিয়ে বেড়াচ্ছেন তার গাছ ।

সালাম সরকারের আম বাগানের ফলনশীল আম গাছের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৭ হাজার। একর প্রতি  উৎপাদন প্রায় ২’শ মন। তার নার্সারিতে বছরপ্রতি চারার উৎপাদন প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার । যার  প্রত্যেকটির গড় মূল্য ৫০ থেকে ১০০ টাকা।

আট থেকে দশ জন প্রশিক্ষিত শ্রমিক সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন সালাম সরকারের খামার। উৎপাদন করছেন কলম। সাথে থেকে সার্বক্ষণিক তাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছেন চিরযৌবনা ও প্রকৃতি প্রেমিক সালাম সরকার। ভাত খাবার মতো সময় পাচ্ছেন না তিনি পরিচর্যা করছেন গাছের। গাছ তথা প্রকৃতিকে ভালোবাসার প্রমান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে তার শেষ কোথায় যে, “গাছগুলোর দোয়ায় যেন জান্নাত পাই ”

তারিকুল হাসান আশিক

গনযোগাযোগের শিক্ষার্থী. ইউল্যাব

No comments

Sorry, the comment form is closed at this time.