Homeফোরাম সংবাদআমরা চাই কোনটা? শিশু গাছের মতো বৃদ্ধি, না অর্কিডের মতো কোষ্ঠকাঠিন্য

আমরা চাই কোনটা? শিশু গাছের মতো বৃদ্ধি, না অর্কিডের মতো কোষ্ঠকাঠিন্য

রকিবুল শিপন, সংবাদ কর্মী, কালের কন্ঠ।

ঢাকা:  শিশুটার জন্ম কবে কেউ জানে না। বাপ-মায়ের ঠিকানা, জাত-কূলও অজানা। কোত্থোকে, কবে, কীভাবে সে এখানে এল, বয়স কত হইছে কেউ কিচ্ছু বলতে পারে না। আমাদের বাড়ির অদূরে অল্প একটু জায়গা নিয়ে সে আছে নিজের মতো করে। কারো সাতে-পাঁচে নেই। খাওয়া-পড়ার চিন্তা নেই। যা জুটে তা-ই সই। কারো কাছে ওকে কোনো দিন হাত পাততে দেখেনি কেউ। কোনো অভাব-অভিযোগ নিয়েও যায়নি কারো চৌকাঠে। ওকে নিয়েও কারো ভ্রু কুঞ্চিত হতে দেখিনি কোনোদিন।

বছর তিনেক আগে কোনো এক গ্রীষ্মের সকালে তার সাথে আমার প্রথম দেখা। সকাল হলেও সেদিন রোদের তেজ ছিল প্রচন্ড। কিন্তু এত খরতাপের মধ্যেও ওর সজীবতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল। সে কথা অবশ্য ওকে কখনোই বলা হয়নি। উত্তর পাব না জেনে কখনো কিছু জিজ্ঞেসও করিনি। ভেবেছি, কি দরকার খোঁচাখুঁচি করে, থাক না তার মতো করে। এরপর যতবার বাড়ি গেছি একবারের জন্য হলেও ওকে দেখে এসেছি। ওর উত্তরোত্তর সজীবতা বৃদ্ধি দেখে মায়া পড়ে গিয়েছিল।

মাঝে অনেকদিন বাড়ি যাওয়া হয়নি। দিন কয়েক আগে হঠাৎ জরুরি তলব এল। আর্থিক বিষয়-আশয় সংক্রান্ত কিছু জটিলতা ছিল, মেটাতে হবে। ছুটি নিয়ে গেলাম বাড়ি। টানা কয়েক দিনের ব্যস্ততায় সব কাজ শেষ করলাম। কাজের চাপে ওর কথা ভুলে গিয়েছিলাম। মনে পড়লো বাড়ির এক মুরুব্বির কথায়। আসার আগের দিন উনি আমাকে নিয়ে গেলেন ওর কাছে। বললেন, ‘বেহায়াটার তামশা দেখছো! হারামিটা চোখের পলকে কত ডাঙ্গর হয়া গ্যাছে। একটু চক্ষু লজ্জাও নাই।‘ কয়েক মুহূর্ত আমি তার কথা ধরতে পারিনি। পরে বুঝলাম ক্ষোভের কারনটা কি। সেদিনের সেই শিশুর গায়ে এখন যৌবনের ছোয়া লেগেছে। নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে শুরু করেছে সে। আশেপাশের সবাইকে ছাড়িয়ে বেড়ে ওঠেছে। স্বাস্থ্যও হয়েছে বেশ ভালো। তাতেও ক্ষতি ছিল না, কিন্তু আরো জায়গা চাইছে। এতেই মুরুব্বি ক্ষেপেছেন। অনেক কষ্ট করে এক নম্বর ইট জোগাড় করে উনি প্রাচীর তুলেছেন। আর শিশুটি কিনা তার প্রাচীরের গায়ে শেকড় ছড়াচ্ছে। এভাবে বাড়তে দিলে একদিন প্রাচীরে ফাটল ধরিয়ে ছাড়বে!

মুরুব্বির সাফ কথা, ওকে এখনই বিদায় করতে হবে। আরো বাড়তে দিলে শেষে প্রাচীরটাকেই আর বাঁচানো যাবে না। বাড়ির সবার সঙ্গে তার কথা হয়ে গেছে। সবাই মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে। যেহেতু জায়গাটুকু আমার তাই কেবল আমার মতের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমার মত বলতে কেবল আমাকে জানিয়ে রাখা আর কি। সিদ্ধান্ত যে নড়চড় হবে না, সেটা কথাতেই বুঝিয়ে দিলেন। আমি নিরুপায় হয়ে তাকে বোঝাতে চাইলাম, থাক না। বাড়ি তোলার সময় তো প্রাচীর ভাঙতে হবেই। অযথা ওকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে কী হবে? বরং ও আরো বড় হলে তো আমাদেরই লাভ। কিন্তু মুরুব্বি অনড়। বললেন, ওর মতো শিশু মেলা পাওয়া যাবে। দরকার হলে নতুন আরেকটা নিয়ে আসবেন। তবুও ওকে রাখা চলবে না। ওর জন্য অন্যরা বাড়তে পারছে না।

আমি কি বলব ভেবে পেলাম না। বিষন্ন মনে ঘরে ফিরলাম। তাকে কী উত্তর দিতাম আমি? এই বয়সে এসে সামান্য একটা শিশু গাছের জন্য আমার মমতার কথা শুনলে উনি হেসে উড়িয়ে দেবেন। ভাববেন একা থাকতে থাকতে ছেলেটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আবোল-তাবোল বকছে। বলাইয়ের মতো আমার কোনো কাকিও নেই যে তাকে দিয়ে সুপারিশ করাব। কিংবা লজ্জা ভুলে গাছটিকে জড়িয়ে ধরে সবাইকে বলব একে কিছুতেই কাটা চলবে না।

সেদিন সারা রাত বৃষ্টি হলো। বৃষ্টির ধারার মতো রক্তক্ষরণ কি আমার ভেতরেও হয়নি!

ফেরার দিন সকালে আবার গেলাম গাছটার কাছে, এবার একা। অদ্ভুত সুন্দর দেখতে হয়েছে। কী অসাধারণ সবুজ পাতাগুলো। দেখতে অনেকটা ছোট ছোট ভালোবাসা চিহ্নের মতো। তাতে জমে থাকা বৃষ্টির ক্ষুদে বিন্দুগুলোতে সূর্যের আলো পড়ে দারুণ মায়ার জাল বুনেছে। এত বড় হয়েছে যে পাতাগুলো আর খালি হাতে নাগাল পাওয়া যায় না। আমাকে দেখে বোধ হয় একটু বিব্রত হলো। আড়ষ্ট ভাবটা কাটাতে তাই হয়তো বাতাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুলে উঠলো, আড়মোড়া ভাঙ্গার চেষ্টা করলো। আর তাতে পাতায় জমে থাকা সোনালী বিন্দুগুলো এসে পড়লো আমার ওপর। শুকে দেখলাম হালকা একটা ঘ্রাণ মিশে আছে। তা থেকে ছিটকে বের হচ্ছে কান্নার আওয়াজ। বুঝলাম আমি যেগুলোকে সোনালী বিন্দু ভেবেছি সেগুলো আসলে অশ্রুকণা। শিশুটা জমিয়ে রেখেছিল, হয়ত আমার জন্যই।

dendrobium-orchid-indoor-air-filter

জীবন যেহেতু আছে তাই গাছটি নিশ্চই জেনে গেছে ওর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা হয়েছে। যে কোনোদিন রায় কার্যকর হবে। ওর অপরাধ কেবল এটুকু ছিল যে, একটু ভালো করে বাঁচার আশায় সে অন্যের প্রাচীরে শেকড় ছড়িয়েছিল। এক নম্বর ইট নষ্ট করছিল। পয়সা দিয়ে কেনা আমের চারাগুলো ওর ছায়ায় বাড়তে পারছিল না। কিংবা কে জানে ওর প্রাণোচ্ছলতা হয়ত প্রবীণ মুরুব্বির ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এতিম শিশুটাকে বাঁচাতে পারলাম না বলে কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু তার চেয়েও বড় কষ্ট অন্য জায়গায়। পয়সা খরচ করে দামি অর্কিড কিনে আমরা গ্রিলে ঝুলিয়ে রাখি, নিয়ম করে পানি দেই, সার দেই। তবুও বাড়তে চায় না ওরা, আর বংশবৃদ্ধিতে তো বেজায় অনীহা। সময় পেরিয়ে যায়, ফুল দিতে চায় না। অথচ কবে কোন পাখির ঠোটে করে উড়ে এসে পতিত জমিতে পড়ে সবার অলক্ষেই দুর্দান্তভাবে বেড়ে ওঠেছিল শিশুটি। আর সেই বৃদ্ধিই কিনা কাল হলো তার। আমরা তাহলে চাই কোনটা? শিশু গাছের মতো বৃদ্ধি, না অর্কিডের মতো কোষ্ঠকাঠিন্য!

 

540263_10151592012839615_1673283630_n

রকিবুল শিপন, সংবাদ কর্মী, কালের কন্ঠ।

No comments

leave a comment