Homeসবুজ সংবাদআধুনিক জাহাজের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে চট্টগ্রাম বন্দর?

আধুনিক জাহাজের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে চট্টগ্রাম বন্দর?

sl-4চট্টগ্রাম বন্দর। বাংলাদেশের আমদানী রপ্তানীর প্রবেশ দ্বার। তবে, যুগের সাথে তাল মেলাতে ততটা অগ্রণী নয় এই বন্দর। বড় কারণ তো, মোটমুটি বড় আকারের জাহাজ ভিড়তেই পারে না বন্দরে। বন্দর চ্যানেলে আকার আর পলি পড়ে এর গভীরতা কমে যা্ওয়া্ও,বন্দরে এখন আর দেখা মেলে না বড় আধুনিক জাহাজ।
আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো পরিচালন ব্যয় কমাতে ছোট জাহাজ ছেড়ে বড় জাহাজের দিকে ঝুঁকছে। এ কারণে ছোট জাহাজের বহর সংকুচিত হয়ে আসছে। মার্চেন্ট মেরিন শিপিং লাইনগুলো লাইফটাইম থাকতেই পুরনো ছোট কনটেইনারবাহী ফিডার জাহাজ বিক্রি করে বড় জাহাজ নির্মাণ করছে। কিন্তু এসব জাহাজের জন্য উপযুক্ত নয় চট্টগ্রাম বন্দর।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ইউরোপের ঋণসংকট ও চীনে প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়ায় বিশ্ববাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে অনেক জাহাজ কোম্পানিই খরচ কমাতে ছোট জাহাজ বিক্রি করে দিচ্ছে। কনটেইনার শিপ মার্কেটের বার্ষিক রিভিউ-২০১৩ অনুযায়ী ২০১২ সালে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছোট পরিসরের জাহাজ। ১ হাজার থেকে ২ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার এসব জাহাজের চাহিদা কম থাকায় নিয়মিত লোকসান গুনছেন এর মালিকরা। এ সময়ে এ ধরনের ৬৭টি জাহাজ বিক্রি ও পাঁচটি জাহাজ বাল্ক জাহাজে পরিবর্তন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে ১৮৬ মিটার দীর্ঘ ও ৮ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের (জাহাজের পানির অংশের গভীরতা) জাহাজ ঢুকতে পারে। গভীরতার কারণে বন্দরে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টিইইউএসের বেশি ফিডার ভেসেল ঢুকতে পারে না। এদিকে এপিএম-মার্সক, এপিএল, হ্যাপাগ-লয়েড, হ্যানজিন শিপিং, সিএসসিএল, এনওয়াইকে লাইন, কে লাইন, ওওসিএলসহ বিশ্বের নামি-দামি শিপিং কোম্পানি তাদের বহর থেকে ধীরে  ধীরে ছোট জাহাজ সরিয়ে ফেলায় চট্টগ্রাম বন্দরের উপযুক্ত জাহাজের সংখ্যা কমে আসছে।
সংশ্লিষ্টরা ভাবছেন, বর্তমানে আধুনিক ফিডার ভেসেলের ধারণক্ষমতা ৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার টিইইউএস। এসব আধুনিক জাহাজের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কোনোমতেই উপযুক্ত নয়। এদিকে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সরকার তিন বছর নানা কর্মপরিকল্পনা নিলেও এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তাই বিশ্বের বড় জাহাজ কোম্পানিগুলো তাদের জাহাজের আকার বাড়ালে চট্টগ্রাম বন্দর বড় ধরনের ব্যবসায়িক সংকটে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একজন সচিবে মতে, এ বন্দরে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়। প্রতিদিন ছয়-সাতটি কনটেইনারবাহী জাহাজ আসা-যাওয়া করছে। বড় বড় শিপিং লাইন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বড় ধরনের ব্যবসা করছে। সে হিসাবে বন্দরের একটি চাহিদা রয়েছে। এ চাহিদার কথা বিবেচনা করেই চট্টগ্রাম বন্দরের উপযোগী জাহাজ আসবে।
তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ সাফাই গাইলেও, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় শিপিং ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বন্দরের ড্রাফট যদি সাড়ে ৯ মিটার করা যায়,  তাহলে দুই থেকে তিন হাজার টিইইউএসের জাহাজ ঢুকতে পারবে। অবশ্য এ জাহাজের সংখ্যাও আন্তর্জাতিক শিপিং ব্যবসায় ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। বর্তমানে যেসব জাহাজ তৈরি হচ্ছে, তার সবই প্যানাম্যাক্স বা পোস্ট প্যানাম্যাক্স জাহাজ। একটি প্যানাম্যাক্স জাহাজ ৩ থেকে ৫ হাজার টিইইউএস কনটেইনার ধারণ করতে পারে। এ রকম একটি জাহাজের দৈর্ঘ্য হয় ২৯৪ মিটার আর ড্রাফট ১২ দশমিক শূন্য ৪ মিটার। পোস্ট প্যানাম্যাক্স জাহাজ ৫ থেকে ১০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার ধারণ করতে পারে। এ ধরনের একটি জাহাজের দৈর্ঘ্য হয় ৩৬৬ মিটার ও ড্রাফট ১৫ দশমিক ২ মিটার। প্যানাম্যাক্স বা পোস্ট প্যানাম্যাক্স— কোনো ধরনের জাহাজই বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারে না।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিপার্স কাউন্সিলের সভাপতি নাসির উদ্দিন আহমেদ এর ভাবনা হলো, বড় ভেসেলের জন্যও বন্দরকে তৈরি হতে হবে। এজন্য যে ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প দরকার, বন্দর কর্তৃপক্ষকে সেটিই করতে হবে।
এদিকে বিদেশী জাহাজ কোম্পানিগুলো ছোট পরিসরের জাহাজ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেও দেশী উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন না। দেশী শিপিং কোম্পানির মধ্যে কেবল এইচআরসির কনটেইনারবাহী জাহাজ থাকলেও এগুলো আর অপারেশনে নেই। নতুন কোনো উদ্যোক্তাও কনটেইনারবাহী ফিডার ভেসেল অপারেশনে আসছেন না। তাই চট্টগ্রাম বন্দর ও দেশী উদ্যোক্তারা এগিয়ে না এলে আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে অচিরেই সমস্যায় পড়বেন ব্যবসায়ীরা।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বন্দরের প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বন্দর উপযোগী জাহাজের সংখ্যা কমছে। এ হারে জাহাজের সংখ্যা কমলে বন্দরের আমদানি-রফতানির গতি শ্লথ হবে। এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে দুই ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। একদিকে বন্দরের আধুনিকায়ন, অন্যদিকে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে।
সালাম মুর্শেদী,যিনি বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তার মত হলো, বন্দরে জাহাজসংকট হলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা কারো কাম্য নয়। এজন্য আগে থেকেই উদ্যোগী হতে হবে। বড় বড় জাহাজ কোম্পানি কেবল বাংলাদেশের কথা বিবেচনায় নিয়ে জাহাজ নির্মাণ করবে না। তারা সাশ্রয়ী পথেই হাঁটবে। সমস্যা সমাধানে দেশী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করতে হবে। বন্দরের গভীরতার কারণে প্রথমে ফিডার ভেসেল, পরে মাদার ভেসেলের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি করতে হয়। এতে ৭ থেকে ১০ দিন সময় বেশি লাগে। গভীর সমুদ্রবন্দর হলে সরাসরি ইউরোপ ও আমেরিকায় আমদানি-রফতানি করা সম্ভব হবে।

No comments

leave a comment